বিশ্বকাপ ফুটবলের রঙে রঙিন গোটা দুনিয়া। বিশ্বজয়ের দামামায় মর্যাদার মঞ্চে খেলছে ৪৮ দেশ। ইতিহাসের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ও রোমাঞ্চকর ফুটবল উৎসবের খেলা বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) নামমাত্র খরচে সরাসরি সম্প্রচার করার ঘোষণা আগেই দিয়েছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। সম্প্রচারস্বত্বের জটিলতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং প্রায় ২০০ কোটি টাকার সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সিণ্ডিকেটের অভিযোগের অবসান ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। কিন্তু ক্যাবল অপারেটরদের চালবাজিতে অনেকেই বিটিভিতে বিশ্বকাপ ফুটবল না দেখতে পাওয়ার অভিযোগ তুলেন। গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাতে এ নিয়ে ভুক্তভোগী সাংবাদিক মাসুদ করিম নিজের ফেসবুক আইডিতে এই সংক্রান্ত একটি পোস্ট দিয়েছিলেন।
সামাজিক মাধ্যমের সেই পোস্ট সরাসরি নজরে আসে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর। অভিযোগ আমলে নিয়ে সরাসরি অ্যাকশনে যান তিনি। প্রতিমন্ত্রী বিটিভির ডিডিজিকে (উপ-মহাপরিচালক) ফোন করে বিষয়টি তদন্ত করার নির্দেশ দেন। ভুক্তভোগীর সঙ্গে দফায় দফায় কথা বলেন বিটিভির কর্মকর্তারাও। তাঁরা একই সঙ্গে অপারেটর ও ফিড অপারেটরদের কাছে গিয়ে তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে মনিটরিং করা হয় পুরো বিষয়টি। সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী। এভাবেই তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপে ভেঙে যায় ক্যাবল অপারেটরদের সিণ্ডিকেট। এখন দর্শকরা স্বাচ্ছন্দ্যে বিটিভিতে উপভোগ করছেন আনন্দের ফুটবল মহারণ। স্বভাবতই সামাজিক মাধ্যমে নেটিজেনদের প্রশংসার জোয়ারে ভাসছেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। তড়িৎ গতিতে সমস্যার সমাধান করায় তথ্য প্রতিমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সেই সাংবাদিকও।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
ডিপ্লোমেটিক করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশের (ডিকাব) সাবেক সভাপতি, সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ করিম গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাতে এক ফেসবুক পোস্টে লিখেন-‘শান্তিবাগে বিটিভি অফ করে দিয়েছে ক্যাবল অপারেটর। বিশ্বকাপ দেখতে পারছি না। ক্যাবল অপারেটররা সিন্ডিকেট করেছে।’ এই পোস্টটি তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর দৃষ্টিতে আসার পর তিনি ক্যাবল অপারেটরদের স্বেচ্ছাচারিতা ও সিণ্ডিকেট ভাঙতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রতিমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় আদাজল খেয়ে মাঠে নামেন বিটিভির কর্মকর্তারা।
এর পরের গল্পও শুক্রবার (১২ জুন) আরেকটি ফেসবুক পোস্টে বিস্তারিত তুলে ধরেন সাংবাদিক মাসুদ করিম। সেখানে তিনি বলেন, ‘কাল বিশ্বকাপ চলাকালে শান্তিবাগে আমার টিভি সেটে বিটিভি দেখা যাচ্ছিল না। আমি বিষয়টি আমার ক্যাবলের ফিড অপারেটরকে জানাই। তিনি আমাকে টি স্পোর্টসে খেলা দেখার অনুরোধ করেন। আমি তখন তাকে আমার বাসায় আসতে বলি। তিনি এলে আমি তাকে বলি যে, আপনি অন্য চ্যানেল দেখতে বলছেন কেন। তিনি তখন কিছুক্ষণ রিমুট টিপে বলেন যে, বিটিভি আসছে না। এটা পাওয়া যাবে না। আমি বিষয়টি বিটিভিতে আমার বন্ধু মোস্তাফিজ ও অনুজ পন্নিকে জানানোর পর জানতে পারলাম ক্যাবল অপারেটররা সিন্ডিকেট করেছে। তারা অনেক জায়গাতেই টি স্পোর্টসে খেলা দেখতে বলছে। পন্নির নিজের টিভিতেও একই সমস্যা হয়েছে। কিছুক্ষণ পর পন্নি আমাকে বলল, আপনাকে বিটিভি থেকে একজন ফোন করবে।

বিটিভির লাইসেন্স শাখার একজন ফোন করে জানতে চাইলেন, বিটিভি দেখা যাচ্ছে কিনা। আমি দেখলাম, দেখা যাচ্ছে। আমি লাইসেন্স শাখার কর্মকর্তা ও পন্নিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিটিভিতে খেলা দেখতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর দেখি, একই সমস্যা। বিটিভি দেখা যাচ্ছে না। অগত্যা আমি বিরক্ত হয়ে ফেসবুকে অপারেটরদের বিটিভি দেখাতে গড়িমসি জানিয়ে একটি পোষ্ট দিলাম।’ জ্যেষ্ঠ এই সাংবাদিক আরও লিখেছেন-‘আমাকে বিটিভি থেকে জানাল মাননীয় তথ্য প্রতিমন্ত্রী বিটিভির ডিডিজিকে ফোন করেছেন বিষয়টি তদন্ত করার জন্য। বিটিভির কর্মকর্তারা আমাকে একের পর এক ফোন দিচ্ছেন। আমি তাদের বলেছি, বিটিভি দেখা যাচ্ছে। তবুও তারা অপারেটর ও ফিড অপারেটরদের কাছে যাচ্ছেন। জিজ্ঞাসাবাদ করছেন।’
তথ্য প্রতিমন্ত্রীর কঠোর পদক্ষেপে অভিভূত সাংবাদিক, প্রশংসা নেটিজেনদের
তথ্য প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কোনো ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকা সত্ত্বেও সাধারণ নাগরিকের সমস্যাকে যেভাবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আমলে নেয়া হয়েছে, তাতে অভিভূত হয়েছেন এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক। প্রতিমন্ত্রীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি তার ফেসবুক পোস্টের শেষে আরও লিখেছেন-‘মাননীয় তথ্য প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আমার পরিচয় নাই। তবুও তিনি যে সমস্যাটাকে আমলে নিয়েছেন তা দেখে আমি অভিভূত। সকল মন্ত্রী এভাবে কাজ করলে আমাদের নাগরিকদের অনেক সমস্যাই দূর করা সম্ভব। ধন্যবাদ, মাননীয় তথ্য প্রতিমন্ত্রী!’
এই পোস্টটি রীতিমতো ভাইরাল হয়েছে। সেখানে নেটিজেনরা বিভিন্ন রকমের মন্তব্য করছেন। আফরাইম রহমান প্রান্ত নামের একজন লিখেছেন- ‘বিষয়টি খুব গুরুত্ব দিয়ে পরলাম, খুব ভালো লাগলো বিষয়টি। ধন্যবাদ মাননীয় তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মহোদয়কে।’ এমডি রনি লিখেছেন-‘একজন নাগরিকের সামান্য অভিযোগ যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে এবং দ্রুত তদন্তের উদ্যোগ নেয়, তবে সেটিই জবাবদিহিমূলক প্রশাসনের ইতিবাচক উদাহরণ। গণমাধ্যমের অবাধ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি লাইসেন্সপ্রাপ্ত সেবাদাতাদেরও জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা জরুরি। ঘটনাটি প্রমাণ করে, সদিচ্ছা ও তৎপরতা থাকলে নাগরিক ভোগান্তি নিরসন অসম্ভব নয়।’ এখানে মন্তব্য করেছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী (এপিএস) মহিউদ্দিন আহমেদও। তিনি লিখেছেন-‘দেশের কারো যেন বিটিভিতে খেলা দেখতে সমস্যা না হয় সেজন্য গতকাল রাতে আমি নিজে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর নির্দেশক্রমে কোয়াবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সাথে কথা বলেছি এবং অনুরোধ করা হয়েছে এমনটি যেন আর কোথাও না ঘটে।’ জামিল রহমান নামে আরেকজনের মন্তব্য-‘সব সেক্টরের সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে আপনার মতো মানুষদের প্রতিবাদ গ্রহণযোগ্য হবে। ধন্যবাদ আপনার লেখার জন্য। আমরাই পারবো সিন্ডিকেটদের বয়কট করতে।’
কালের আলো/এমএএএমকে

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬ । ৭:৫৮ অপরাহ্ণ