রোগীর জন্য বরাদ্দকৃত টাকা অন্য খাতে ব্যয় সমাজসেবার

বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশের সময়: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬ । ১:২১ অপরাহ্ণ

আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন নীতিমালা অনুযায়ী সমাজসেবা অধিদপ্তরের ছয়টি রোগে আক্রান্তদের বছরে একবার অর্থসহায়তা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা যোগসাজশ করে গত কয়েক বছরে কয়েকজনকে একাধিকবার আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। ভুয়া রোগী সাজিয়ে, চিকিৎসকের স্বাক্ষর জাল করে এবং পরীক্ষার রিপোর্ট ছাড়াই অর্থসহায়তা দিয়ে সরকারি অর্থ লোপাটও করেছে তারা।

নীতিমালা অনুযায়ী, চিকিৎসা সহায়তার জন্য অনুদান হিসেবে বরাদ্দ করা অর্থ কেবল চিকিৎসা সহায়তার ক্ষেত্রেই ব্যয় করতে হবে। সরকার আনুষঙ্গিক খাতের ব্যয় মেটানোর জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ দিয়ে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, সমাজসেবা অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রোগীর জন্য বরাদ্দকৃত টাকা অন্য খাতে ব্যয় করেছে।

জানা যায়, সরকার সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ক্যানসার, কিডনি রোগ, লিভার সিরোসিস প্রভৃতিতে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তার জন্য ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬ হাজার, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১০ হাজার, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৫ হাজার এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩০ হাজারসহ মোট ৬১ হাজার রোগীর জন্য ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সেই বরাদ্দের অর্থ ২৫৯ রোগীকে টাকা না দিয়ে এক কোটি ২৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা টেলেক্স, ফ্যাক্স, কম্পিউটার, স্টেশনারি ক্রয় ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্মানীতে ব্যয় করেন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২৫ লাখ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩০ লাখ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৯ লাখ ৫০ হাজার এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়।

অভিযোগ রয়েছে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. খায়রুল আলম সেখের বিরুদ্ধে এতিম না থাকা সত্ত্বেও এতিমখানার নিবন্ধন, বরাদ্দগ্রহণ ও বাবার নামে ফাউন্ডেশন গঠন করে সরকারি বরাদ্দ নেওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে দুদকের হাতে। অভিযোগ আছে সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের বিরুদ্ধেও। মন্ত্রী থাকাকালে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য করার পাশাপাশি ভুয়া রোগী সাজিয়ে সরকারি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।

নিয়ম অনুযায়ী, জটিল রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি বছরে একবার ৫০ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা পাবেন। কেউ এক বছরে দুবার আবেদন করতে পারবেন না। কিন্তু ২০১৭-১৮ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৮১ জনকে একবারের বেশি অর্থসহায়তা দেওয়া হয়েছে৬৮ জনকে দুবার, ১২ জনকে তিনবার এবং একজনকে চারবার অর্থসহায়তা দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। ঢাকার আগারগাঁও কার্যালয়, ঢাকা জেলা কার্যালয়, যশোর, নড়াইল, রাজশাহী, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ সমাজসেবা অধিদপ্তরের কার্যালয়ের কর্মকর্তারা এসব অনিয়ম-দুর্নীতি করেছেন।

চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বাসিন্দা মাসুম বিল্লাহ ক্যানসার রোগী হিসেবে নোয়াখালীর বাসিন্দা জিসানের রোগনির্ণয়-পরীক্ষার রিপোর্টের কপি দিয়ে চট্টগ্রাম সমাজসেবা কার্যালয়ে আবেদন করেন। কর্মকর্তারা তাকে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে বলে দেখান। গাজীপুরের নাছিমা শাহীনের রোগসংশ্লিষ্ট টেস্ট রিপোর্ট নেই, চিকিৎসকের প্রত্যয়ন নেই; তাকেও ঢাকা অফিস থেকে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে বলে দেখানো হয়। এভাবে রোগী নয়, তবু ৩০২ জনকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, মাগুরা, খুলনা, দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জামালপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, মুন্সীগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলা সমাজসেবা অফিস থেকে ৫০ হাজার  করে এক কোটি ৫১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।

বলা আছে, প্রকৃত রোগী যেন সরকারের আর্থিক সহায়তা পায় সে জন্য রোগীর জাতীয় পরিচয়পত্র, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ও রোগনির্ণয়-পরীক্ষার রিপোর্টের ভিত্তিতে রোগীকে আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করতে হবে। অভিযোগে বলা হয়েছে, কিন্তু মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অন্য রোগীর ব্যবস্থাপত্রের ফটোকপি, চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র ছাড়া আবেদনপত্র, রোগপরীক্ষার রিপোর্ট ছাড়া আবেদনপত্র ও ভুয়া পরিচয়পত্রের বিপরীতে ৩০২ জনকে অর্থসহায়তা দিয়ে সরকারের এক কোটি ৫১ লাখ টাকার ক্ষতিসাধন করেছেন।

কালের আলো/এম/এএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন