কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নাশকতার আশঙ্কা, ম্যাজিষ্ট্রেসি ক্ষমতায় ৯ দিন মাঠে থাকবে সশস্ত্র বাহিনী

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬ । ৮:৩৬ অপরাহ্ণ

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের আগামীকাল মঙ্গলবারের (২৩ জুন) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঘিরে নাশকতার শঙ্কা করছে সরকার। এ পরিস্থিতিতে সারাদেশে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সোমবার (২২ জুন) ঢাকাসহ যে তিন মহানগর ও তিন জেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেসব এলাকায় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও তদূর্ধ্ব সমপদমর্যাদার কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (কোস্টগার্ড ও বিজিবিতে প্রেষণে নিয়োজিত সমপদমর্যাদার কর্মকর্তাসহ) ৯ দিনের জন্য বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দিয়েছে সরকার। এদিন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকবে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুর মহানগর এবং নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলায় ৯ দিন মাঠে থাকবে সশস্ত্র বাহিনী। ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৬৪,৬৫, ৮৩,৮৪, ৮৬,৯৫ (২), ১০০,১০৫, ১০৭,১০৯, ১১০,১২৬, ১২৭, ১২৮, ১৩০, ১৩৩ ও ১৪২ ধারার অধীন অপরাধগুলো আমলে নিতে পারবেন বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, দিনটি সামনে রেখে দলটি মিছিল, শোডাউন ও অন্যান্য কর্মসূচি পালন করতে পারে, যা বেআইনি। এরপর বিকেলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এর আগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেন্দ্র করে তিন মহানগর এলাকা ও তিন জেলায় সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ বিষয়ে সোমবার (২২ জুন) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারকে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ বিভিন্ন সংগঠন দেশের বিভিন্ন স্থানে বেআইনি মিছিল, শোডাউন ও অন্যান্য কর্মসূচি করছে। এর মাধ্যমে নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার পাশাপাশি জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। চিঠিতে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুর মহানগর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলায় শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জনগণের জানমালের সুরক্ষায় ৯ দিনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনা মোতায়েনের জন্য অনুরোধ করা হয়। ২২ থেকে ৩০ জুন ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ হিসেবে সেনাসদস্যরা কাজ করবেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে তৎপরতা রুখতেই ছয় জেলায় সেনা মোতায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব জেলায় সেনা মোতায়ন হচ্ছে বলে জানান তিনি। সচিবালয়ে সোমবার (২২ জুন) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অফিস কক্ষের সামনে এসব কথা বলেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আগের তুলনায় বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো আছে। সভা-সমাবেশ করা বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক অধিকার, এতে গণতন্ত্র বিকশিত হচ্ছে। ৬ জেলায় সেনা মোতায়েনের বিষয়ে তিনি বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ মাফিয়া আওয়ামী লীগ বিভিন্ন জেলায় অপতৎপরতা চালাতে পারে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্তি বাাড়াতে হয়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের অপতৎপরতা রুখতেই সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। তবে দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়নি বলে দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার দাবি, বিগত যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো আছে।

দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ২৩ জুন। ১৯৪৯ সালের এই দিনে পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেনে দলটির জন্ম হয়। তবে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে গত বছরের মতো এবারও দিনটি পালনের সুযোগ পাচ্ছে না আওয়ামী লীগ। যদিও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের আগেও প্রতিবছরই ব্যাপক কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করে আসছিল দলটি। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ড. ইউনূসের সরকার ২০২৫ সালের মে মাসে নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে।

মাঠ পর্যায়ে পুলিশের ‘জরুরি বার্তা’, ঢাকাজুড়ে ১৮ হাজারেরও বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন
গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি ‘জরুরি বার্তা’ পাঠানো হয় মাঠপর্যায়ে। সেদিন সারাদেশে পুলিশকে ‘প্রয়োজনীয় সতর্কতার’ পাশাপাশি ‘নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা’ নিতে নির্দেশনা দেয় সদর দপ্তর। সেখানে বলা হয়, সেদিন দলটির কর্মীরা দেশের বিভিন্ন জেলায় দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন এবং প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ব্যানার নিয়ে প্রকাশ্যে মিছিল করতে পারে। এর ফলে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে এনসিপির নেতাকর্মী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সাথে ‘সংঘর্ষ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে’। পাশাপাশি তাদের কর্মকাণ্ডে বাধা দিলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর উপর ক্ষুব্ধ হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।’

গত শুক্রবার (১৯ জুন) রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সুনির্দিষ্ট কোনো নাশকতার খবর নেই। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ অভিযানে অস্ত্র, মাদক ও অন্য অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ডিএমপি জানায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ঢাকাজুড়ে ১৮ হাজারেরও বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। রোববার (২১ জুন) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, রাজধানীজুড়ে ২০০টিরও বেশি কৌশলগত স্থানে পুলিশের বিশেষ পিকেট ও চেকপোস্ট ডিউটি পরিচালনা করা হবে। একই সঙ্গে ঢাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মহানগরের সবকটি প্রবেশপথে কড়া চেকপোস্ট ও তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার থাকবে, যাতে কোনো বহিরাগত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে।

নিয়াজ মেহেদী বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও নিটোল করতে নিয়মিত পুলিশের পাশাপাশি মাঠে সক্রিয় থাকবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিটসমূহ। এর মধ্যে ডিবি (গোয়েন্দা শাখা) এবং সিটিটিসি (কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম) ইউনিট সার্বক্ষণিক মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি যেকোনো ধরনের আগাম নাশকতা বা ষড়যন্ত্র রুখে দিতে সাদা পোশাকে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এবং আইএডি (ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন) ব্যাপক গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

তিনি জানান, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি দ্রুত ও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করার জন্য মহানগরের বিভিন্ন পয়েন্টে ১৫টি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হবে। এছাড়া ঢাকার ৪টি প্রধান কন্ট্রোলরুমে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক ফোর্স স্ট্যান্ডবাই বা রিজার্ভ রাখা হবে, যেন ডাক পাওয়া মাত্রই তারা অ্যাকশনে যেতে পারে।

ডিএমপি সূত্র জানায়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিএমপির ১৮ হাজারেরও বেশি অফিসার ও ফোর্স মাঠে থেকে নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করবে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এ বিশাল নিরাপত্তা কর্মযজ্ঞ কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং স্বয়ং ডিএমপি কমিশনারসহ পুলিশের সকল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সরেজমিনে মাঠে উপস্থিত থেকে সার্বিক নিরাপত্তা ডিউটি তদারকি ও দিকনির্দেশনা প্রদান করবে। জানা গেছে, জুন মাসে এ যাবৎ রাজধানী ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং অপরাধ দমনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) জুনের শুরু থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত বিগত ২০ দিনে মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত বিশেষ অভিযানে ঝটিকা মিছিলের প্রস্তুতিকালে ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

৫ জেলায় বিজিবি মোতায়েন করেছে সরকার
দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবেলায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন করেছে সরকার। কক্সবাজার, মাদারীপুর, শেরপুর, গাজীপুর ও মৌলভীবাজারে ৩০ জুন পর্যন্ত বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবে বলে সোমবার (২২ জুন) বিজিবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, অন্যান্য জেলায় প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে মোতায়েনের জন্য বিজিবি সদস্যরা ‘স্ট্যান্ডবাই’ থাকবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

কালের আলো/এমএসআইপি/এমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন