মধ্যপ্রাচ্যের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। তবে এই বাজারে বরাবরই অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ ছিল। ২০০৮ সালে শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার পর ২০১৬ সালে আবার চালু হয়। পরে দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়া আবারও বন্ধ করে মালয়েশিয়া। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময় বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার চালু করতে চলমান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা।
বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হবে। দ্রুত সংশোধন করা না হলে নতুন করে সমঝোতা স্মারক সই করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ হতে পারে। অবশ্য দুই দেশই মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমাতে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং সাশ্রয়ী করতে একমত হয়েছে। এতে কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় কমে আসবে। তবে এসব প্রক্রিয়া শেষ করে বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে দেওয়া হবে।
জানা যায়, এর আগে ২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর নতুন সমঝোতা চুক্তি হলেও শ্রমবাজার চালু হতে প্রায় তিন বছর সময় লাগে। ২০২২ সালের আগস্ট থেকে আবার কর্মী যাওয়া শুরু হয়। তবে ২০২৪ সালের ১ জুন আবারও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন শর্ত শিথিল নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরেও দেশটির শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। দুই দেশের সরকারের আলোচনার মাধ্যমে আইনি জটিলতা দ্রুত কাটিয়ে শ্রমবাজার আবারও চালু হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)।
সংগঠনটির সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, দুই সরকার আলোচনা করে যে সিদ্ধান্ত নেবে এবং যে পদ্ধতি নির্ধারণ করবে, আমরা সেই পদ্ধতিতেই কর্মী পাঠাতে চাই। আমাদের প্রত্যাশা, দ্রুতই কর্মী পাঠানো শুরু হবে।
সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির মতো বিতর্ক এড়াতে সরকার ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন জনশক্তি রফতানিকারকরা। বায়রার সাবেক সভাপতি মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, সরকার যদি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর প্রতি ইতিবাচক ভূমিকা নেয় এবং যথাযথ স্বীকৃতি দেয়, তাহলে আমারা আরও উৎসাহ নিয়ে সরকারের কর্মসংস্থান পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করতে পারব।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কর্মী পাঠানোর প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে আগামী পাঁচ বছরে বিদেশে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সরকার যদি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে, তাহলে এমন একটি ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব, যাতে শ্রমিকদের অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। বিষয়টি পুরোপুরি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী গত মঙ্গলবার সংসদে জানিয়েছেন, সরকার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে কাজ করছে। আশা করা যায়, দ্রুত দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর পথ সুগম হবে। এর আগে গত সোমবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে তারেক রহমান বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার অনুরোধ জানান। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা এবং যত দ্রুত সম্ভব শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার অনুরোধ জানিয়েছি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে। আমরা একমত হয়েছি, নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং সাশ্রয়ী হতে হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমে এবং কর্মীদের খরচ হ্রাস পায়।’
বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে প্রতারণা, প্রতিশ্রুত চাকরি ও বেতন না দেওয়া এবং অমানবিক পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করায় মালয়েশিয়া বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার সমালোচনার মুখে রয়েছে। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, বাংলাদেশি কর্মীদের শোষণ, তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ বা শুধু কোম্পানির লাভের জন্য তাদের ব্যবহার করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। কর্মী নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া ন্যায্য ও মানবিক করা এবং শ্রমিক ও তাদের পরিবারের স্বার্থ রক্ষায় জোর দিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহিম।
কালের আলো/এম/এএইচ

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬ । ৬:৩৫ অপরাহ্ণ