ব্যাংক নোট কখন এবং কেন বাতিল করা হয়?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬ । ১২:৪৭ অপরাহ্ণ

সম্প্রতি ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছেন সরকারদলীয় এক সংসদ সদস্য। তবে এ বিষয়ে সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। নোট দুটি আগের মতোই বৈধ রয়েছে। এ প্রস্তাব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্বের অনেক দেশেই ব্যাংক নোট বাতিলের ইতিহাস আছে। এমনকি বাংলাদেশেও অতীতে মুদ্রা বাতিলের নজির রয়েছে।

কিন্তু সেটা কোনো স্বাভাবিক সময়ের ঘটনা নয়। সাধারণত অস্বাভাবিক সময় বা বিশেষ পরিস্থিতিতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। তিনি বলছিলেন, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি।

তাহলে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে এবং কেন ব্যাংক নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়? এ ধরনের সিদ্ধান্ত অর্থনীতির ওপর কোন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে?

কী বলা হয়েছিল সংসদে?

বাংলাদেশে সংসদের চলমান দ্বিতীয় অধিবেশনে পাঁচশ ও এক হাজার টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাবটি করেন বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন।

গত রোববার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে মি. খোকন দাবি করেন, মানুষের কাছে নগদ টাকা থাকার পরও আস্থা না থাকায় তারা সেটি ব্যাংকে রাখছেন না।

নগদ টাকা ঘরে, যেহেতু ব্যাংকের ওপর আস্থা নাই…এবং যারা স্বৈরাচার ছিল, তারা টাকাটা গোছায় রেখে নগদ টাকা ফেলে চলে গেছে…ঘরে ঘরে টাকা আছে, কিন্তু ব্যাংকে রাখে না মানুষ, সংসদে বলেন মি. খোকন।

ঘরের ওই অর্থ ব্যাংকে ফেরাতে পাঁচশ ও এক হাজার টাকার নোট বাতিল করার প্রস্তাব করেন তিনি। সেইসঙ্গে, বাতিল করার আগে পুরনো নোট ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য দুই মাস সময় বেঁধে দেওয়ার আহ্বান জানান।

এতে বাজেট ঘাটতিও ফিলাপ (পূরণ) হবে যাবে। দুই লক্ষ, আড়াই লক্ষ কোটি টাকার ব্যাংক নোট, টাকাটা লিগ্যাল (বৈধ) হয়ে যাবে এবং সেটা আপনার রি-ইনভেস্টমেন্ট (পুনরায় বিনিয়োগ) হবে। মানে ইকোনমিক হুইল (অর্থনীতির চাকা) ঘুরবে, বাজেটের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে খোকন এসব কথা বলেন।

নোট বাতিল হয় কেন?

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একটি দেশের সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা কারণে ব্যাংক নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান একটি কারণ হলো কালো টাকার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে সেটাকে ব্যাংকিংখাতে যুক্ত করা।

সরকার যদি মনে করে যে, দেশে কালো টাকার পরিমাণ অনেক বেশি এবং মোট জনসংখ্যার একটা বড় অংশের মানুষের কাছে নগদ অর্থ আছে, তখন কালো টাকার প্রভাব কমিয়ে সেটাকে ব্যাংকে ঢোকানোর জন্য নোট বাতিল করতে দেখা যায়। বলছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর।

তিনি আরও বলেন, কালো টাকা বলতে মূলত আয়করের হিসেবে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কর ফাঁকি দেওয়া টাকাকে বোঝায়। এক্ষেত্রে ঘুস-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকাকে যেমন অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তেমনই কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সৎ পথে অর্থ উপার্জন করার পরও যদি আয়ের হিসেবে সেটা না দেখান বা কর না দেন, সেটাও একইভাবে অর্থনীতিতে কালো টাকা হিসেবে বিবেচিত হয়।

কালো টাকার পাশাপাশি জাল নোটের প্রসার ঠেকাতেও অনেক সময় ব্যাংক নোট বা মুদ্রা বাতিল করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সারা দেশে জাল টাকার দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় সেটি নিয়ন্ত্রণে ১৯৭৩ সালে জলছাপবিহীন একাধিক ব্যাংক নোট বাতিল ঘোষণা করেছিল তৎকালীন সরকার।

অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অর্থায়ন বন্ধ করতে ব্যাংক নোট বাতিল করার নজির আছে। ২০১৬ সালে ভারত সরকার যে পাঁচশ ও এক হাজার রুপির নোট বাতিল করেছিল, সেটার পেছনেও এ দুটি কারণ কাজ করেছিল।

এর বাইরে, একটি দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটলেও আগের মুদ্রা বাতিল করে নতুন মুদ্রা প্রচলনের ঘটনা ঘটতে দেখা যায় বলে জানান অর্থনীতিবিদরা।

এক্ষেত্রে বাতিল হতে যাওয়া ব্যাংক নোট বা মুদ্রা ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়। ফলে যাদের কাছে নোটগুলো আছে, তাদের বড় অংশই দেখা যায় ব্যাংকে টাকাটা জমা রাখে। এর ফলে ব্যাংকে তারল্যের পাশাপাশি সরকারের আয়কর সংগ্রহের হারও বেড়ে যায়।

সফলতা কতটা?

কালো টাকাকে ব্যাংকিংখাতে যুক্ত করা, সন্ত্রাস বা দুর্নীতি বন্ধের উদ্দেশ্যে অতীতে বিভিন্ন দেশে ব্যাংক নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও কম দেশই এক্ষেত্রে সুফল পেয়েছে বলে জানাচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।

এখন পর্যন্ত যত দেশ এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে, তাদের বেশিরভাগ দেশে দেখা গেছে যে, অর্থনীতি খুব একটা লাভবান হয়নি। যাদের কাছে কালো টাকা বা নগদ অর্থ রয়েছে, তারা দেখা গেছে নিজেদের লোক দিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে ব্যাংক থেকে পুরনো নোট পরিবর্তন করে নতুন নোট সংগ্রহ করে ফেলেছে।

আবার কিছু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সুফল পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর উল্টো প্রভাবও দেখা গেছে। কালো টাকা ব্যাংকে জমা পড়ার পর দেখা গেছে হঠাৎ করে ব্যাংকে তারল্য বেড়ে গেছে। পরে সেগুলো উৎপাদনশীলখাতে পুনরায় বিনিয়োগ করা যায়নি, কিন্তু গ্রাহককে ঠিকই সুদ দিতে হয়েছে। এতে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আবার ব্যাংক নোট বাতিল করার কারণে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, পরবর্তীতে দেখা গেছে তারা ক্ষতি পোষানোর জন্য ঘুস-দুর্নীতি বা কালো টাকার ব্যবহার আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে সরকারের লক্ষ্য পূরণ হয়নি। এজন্য মুদ্রা বাতিল না করে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রতি জোর দেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক কবীর বলেন, ব্যাংক নোট বাতিল করেও যেহেতু খুব একটা লাভবান হওয়ার নজির সেভাবে নেই, সেজন্য এটাকে নিরুৎসাহিত করা হয়। বরং কালো টাকা বা বেআইনি অর্থের লেনদেন যেন না হয়, সেদিকেই সরকারের নজর দেওয়াটা জরুরি।

মুদ্রা বাতিলে যত ঝুঁকি

ব্যাংক নোট বাতিলের সিদ্ধান্তে লাভের চেয়ে ক্ষতির অংশই বেশি বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, এক্ষেত্রে প্রথম ক্ষতিটা হলো সরকার ও দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হওয়া।

বিষয়টি আরেকটু ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, একটি দেশের সরকার কোনো ব্যাংক নোট বাতিল করার ঘোষণা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেদেশের অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়। কারণ মানুষ প্যানিকড বা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে যে, তার অর্থের এখন কী হবে!

তিনি আরও বলেন, এই আতঙ্ক থেকেই তখন তারা সবাই তাড়াহুড়ো করে ব্যাংকে পুরনো মুদ্রা জমা দিয়ে নতুন মুদ্রা সংগ্রহ করতে চায়। এর ফলে নগদ অর্থে সংকট দেখা দেয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে

মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে।

ফলে সাধারণ মানুষ দেশের সরকার ও অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। তারা মনে করে যেকোনো সময় সরকার যে কোনো মুদ্রা বাতিল করতে পারে।

এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতির ওপর আস্থা রাখতে না পারায় অনেকে বিকল্প হিসেবে স্বর্ণ বা ডলারের মতো অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর চিন্তা করেন।

অন্যদিকে, পুরনো নোট বাতিল করে নতুন ব্যাংক নোট ছাপাতে গিয়ে সরকারের বাড়তি ব্যয়ও হয়।

১৯৮৪ সালে নাইজেরিয়ায় তৎকালীন সামরিক সরকার পুরনো নোট বাতিল করে নতুন নোট ছাপাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

সেইসঙ্গে, দেশটিতে মূল্যস্ফীতিও ব্যাপক আকারে বেড়ে গিয়েছিল বলে জানান অর্থনীতিবিদরা।

অন্যদেশের অভিজ্ঞতা কেমন?

ঘুস-দুর্নীতি, কালো টাকা, জালনোট এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন বন্ধের উদ্দেশ্যে ২০১৬ সালে পাঁচশ ও এক হাজার রুপির নোট বাতিল করেছিল ভারতে মোদি সরকার।

এর ফলে দেশটির প্রচলিত নগদ অর্থের প্রায় ৮৬ শতাংশ রাতারাতি অচল হয়ে যায়। হঠাৎ করে নেওয়া সিদ্ধান্তের ফলে সারা দেশে মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশই পুরনো নোট নেওয়া বন্ধ করে দেন। ফলে নতুন নোট সংগ্রহ করতে সাধারণ মানুষ ব্যাংকে ভিড় করতে শুরু করেন।

এতে ব্যাংকে অর্থ সংকট চরমে পৌঁছায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কয়েক মাস ধরে দিনরাত নতুন ব্যাংক নোট ছাপিয়ে সেগুলো বিমানবাহিনীর সাহায্যে দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় মোদি সরকার।

নতুন নোট ছাপিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে বন্টন করতে গিয়ে ভারত সরকারকে আগের অর্থ বছরের তুলনায় ওইবছর সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ করতে হয়েছে বলে জানান দেশটির অর্থনীতিবিদ প্রসেনজিৎ বসু।

অন্যদিকে, ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, বাতিল হওয়া নোটের প্রায় ৯৯ শতাংশই ব্যাংকে জমা পড়েছে। ফলে কালোটাকা উদ্ধারের লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, সেটা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন