মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন করবে সরকার: মাহদী আমিন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬ । ৯:৩৬ অপরাহ্ণ

সরকার মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা নিয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে সব শিক্ষার্থীর জন্য কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। পাশাপাশি চালু হবে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা। চতুর্থ শ্রেণি থেকে সংস্কৃতি ও খেলাধুলা বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ইউনেস্কো আয়োজিত ‘গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশন সিস্টেম ট্রান্সফরমেশন গ্র্যান্ট অ্যান্ড মাল্টিপলার গ্র্যান্ট ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র এসব কথা বলেন।

মাহদী আমিন বলেন, আমরা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে একটি তৃতীয় ভাষা চালু করতে যাচ্ছি। সব শিক্ষার্থীর জন্য এটি চালু হতে কিছুটা সময় লাগবে, তবে সেই প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণি থেকে আরও দুটি বিষয় বাধ্যতামূলক করা হবে। একটি সংস্কৃতি, অন্যটি খেলাধুলা। পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা এমন একটি আদর্শ নিয়ে এগিয়ে যাবে, যাকে আমরা বলি ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’।

তিনি বলেন, আমরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা চাই, যেখানে শিক্ষার্থীদের শিখতে বাধ্য করা হবে না; বরং তারা একটি সহযোগিতামূলক পরিবেশে কাজ করবে। সেখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে সর্বোত্তম সম্পর্ক গড়ে উঠবে এবং তারা নিজ নিজ প্রতিভা বিকাশে কাজ করবে। এগুলোই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার আদর্শ ও নীতি। আমরা যখন সামনে এগিয়ে যাব, তখন এসব নীতি বাস্তবায়নে এবং এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সব অংশীজনের আরও সহযোগিতা প্রয়োজন।

রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে নতুন সরকারের জন্য ৪৮ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের ঘোষণায় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কৃতজ্ঞতা জানান মাহদী আমিন।

তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, এই অর্থ শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে সর্বোত্তমভাবে ব্যবহার করতে পারব, যা দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রয়োজনীয়তা ছিল।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, আজ যে অনুদান পাচ্ছি, তা সরকারের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। আমরা চাই, আমাদের সব উন্নয়ন অংশীদার ও অংশীজনের মধ্যে সমন্বয় বজায় থাকুক। প্রধানমন্ত্রীর প্রণীত নীতিকাঠামো এবং মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের সঙ্গে অনুদান ও দক্ষতার ব্যবহার যেন সরাসরি সঙ্গতিপূর্ণ হয়। আমরা যেমন এই তহবিলকে স্বাগত জানাতে এসেছি, তেমনি সরকারের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে চাই। যাতে বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে এই নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়।

সব আন্তর্জাতিক অংশীজন ও সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের অংশীদারদের ধন্যবাদ জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, একসঙ্গে কাজ করলে উল্লেখযোগ্য ও অর্থবহ পরিবর্তন আনা সম্ভব। শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও ন্যায়সঙ্গত করে গড়ে তুলতে চাই। একই সঙ্গে শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এবং ‘মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম’-এর মতো উদ্যোগকে আমরা অগ্রাধিকার দিতে চাই। এ কারণে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য একই ইউনিফর্ম, একই স্কুলব্যাগ ও একই জুতা চালু করা হচ্ছে। পাশাপাশি ‘মিড-ডে মিল’ প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এটি এখন জাতীয় পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা বিভিন্ন মতামত পাচ্ছি এবং সে অনুযায়ী কাজের পদ্ধতি নতুন করে সাজাতে হবে।

মাহদী আমিন বলেন, পাঠদানের জন্য শিক্ষকরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদের বৃহত্তর পরিমণ্ডলের দিকেও নজর দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, শিক্ষণ পদ্ধতি, প্রযুক্তিগত হস্তক্ষেপ, বৈষম্য হ্রাসসহ নানা বিষয়। আমরা এগুলোকে ৩৬০ ডিগ্রি দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখি। তাই শিক্ষকরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। প্রধানমন্ত্রী যেমন বলেছেন, শিক্ষকদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, প্রশিক্ষণ দিতে হবে, আরও পরিশীলিত করে গড়ে তুলতে হবে এবং তাঁদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সেরা প্রশিক্ষণ পদ্ধতির সঙ্গে সমন্বয়ও নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান বৃহৎ শিক্ষা ব্যবস্থা ও মাল্টিপলার গ্র্যান্ট শিক্ষকদের সক্ষমতা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে, যা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমরা বিশ্বাস করি, সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে একসঙ্গে কাজ করে নিশ্চিত করা হবে, যাতে এই অনুদান শিক্ষকদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা কাজে লাগাতে সহায়তা করে এবং একই সঙ্গে প্রধান অংশীজনদের সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকারের কর্মসূচিও এগিয়ে যায়।

মাহদী আমিন বলেন, আমরা দেখছি, এখানে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের একটি গ্র্যান্ট নিশ্চিত হয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক অংশীজনরা একত্রিত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশীদারিত্বভিত্তিক করতে চাই। এর মাধ্যমে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর মেধার বিকাশ, সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ এবং দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে। যাতে তারা বাংলাদেশ থেকে বিশ্বনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এ লক্ষ্যেই আমরা পাঠ্যক্রম উন্নয়নের কাজ করছি। পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রম, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিকে শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করছি।

প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, প্রতিটি কার্যক্রম তখনই সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, যখন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কান্ডারি শিক্ষার্থীদের এবং তাঁদের গড়ে তোলা শিক্ষক তথা শিক্ষাবিদদের দক্ষ, যোগ্য ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারব। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের মাধ্যমে সবাই মিলে একটি সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। এর মৌলিক ভিত্তি হবে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার। আমরা বিশ্বাস করি, সবাই একযোগে কাজ করলে আগামী দিনের বাংলাদেশকে সেইভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে, যেমনটি প্রধানমন্ত্রী প্রত্যাশা করেন। আমরা একটি আধুনিক, যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা চাই, যেখানে শিক্ষার্থীরা দেশপ্রেমিক, সুনাগরিক, যোগ্য ও দক্ষ হিসেবে গড়ে উঠবে এবং আগামী দিনের সুশিক্ষিত ও মেধাবী শিক্ষক তৈরির ভিত্তিও শক্তিশালী হবে।

অনুষ্ঠানে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ শিক্ষা ও প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউনেস্কোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/এসআর/এএএন

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন