বৃহৎ পরিমণ্ডলে প্রশিক্ষণে রণপ্রস্তুতি সেনাবাহিনীর, শৃঙ্খলা ও সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে গুরুত্ব প্রধানমন্ত্রীর

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো:
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬ । ১০:৪০ অপরাহ্ণ

দীর্ঘ বিরতির পর পুরোদমে গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ শুরু করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বহি:শত্রুর আগ্রাসন রুখে দিতে নিজেদের সমর সক্ষমতাকে জানান দিতে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জামাদির কৌশলগত ব্যবহার চলছে প্রশিক্ষণে। এই প্রশিক্ষণ চলাকালেই অকুতোভয় কর্মকর্তা ও সৈনিকদের উৎসাহিত করতে সাত সকালেই ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জে আকস্মিক হাজির হলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় নিরাপত্তায় নিজের সরকারের সুদৃঢ় অঙ্গীকার থেকেই কী-না দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোন প্রধানমন্ত্রী স্বশরীরে উপস্থিত হলেন গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণে। পায়ে হেঁটে ছুটলেন এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সেনা সদস্যদের জন্য রান্না করা দুপুরের খাবার ও চা খেলেন প্রটোকল ভেঙে। ঘুরে ঘুরে অবলোকন করলেন যুদ্ধের ময়দানে সেনা সদস্যদের কঠোর অবস্থান, রণপ্রস্তুতি ও মহড়া। কখনও নেমে পড়লেন সেনা বাঙ্কারে।

প্রধানমন্ত্রী মতবিনিময় করলেন কর্মকর্তা ও সৈনিকদের সঙ্গে। দেশ মাতৃকাকে নিরাপদে রাখতে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত অসীম সাহসী সৈনিকদের দিয়েছেন দিকনির্দেশনাও। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৫৫ বছরের গৌরবোজ্জ্বল পথযাত্রায় সূচিত হলো নতুন এক ইতিহাস। ‘কঠিন প্রশিক্ষণ সহজ যুদ্ধ’ নীতিতে বিশ্বাসী আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ় মনেবলের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নিজের বাগ্মিতা, সহজ-সরল ভাষাশৈলীতে সরকারপ্রধান যেন তাদের আকর্ষণ করলেন চুম্বকের মতোই। গুরুত্বারোপ করলেন পেশাদার প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও সর্বোচ্চ প্রস্তুতি বজায় রাখার ওপর। পুরো ঘটনাপ্রবাহটি মঙ্গলবার (৭ জুলাই) জেলার সিংগাইর উপজেলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের অধীনে ৮ বীর-এর গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ এলাকার।

পুরো দৃশ্যপটে তাঁর সঙ্গী ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও সাভারের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল এস এম আসাদুল হক, স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) ডিজি মেজর জেনারেল মাহবুবুস সামাদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ তারিক, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আব্দুল্লাহ এম ছালেহ, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ উর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা।

একটি আধুনিক ও উন্নত দেশের স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয় সেনাবাহিনীকে। আধুনিক ও উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষায় বহি:শত্রুর আক্রমণ মোকাবিলায় স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ এই অঙ্গ অপরিহার্য। সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের অধীনে ৮ বীর-এর গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ এলাকায় সেই কথাটি স্মরণ করিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেনাসদস্যদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের জনগণ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ওপর গভীর আস্থা রাখে। জাতীয় সংকট ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর গৌরবময় ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি পেশাদার প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও সর্বোচ্চ প্রস্তুতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।

এর আগে মহড়া চলাকালে প্রধানমন্ত্রী ‘ফার্ম বেস’-এর বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) ও ইউনিটের কমান্ডিং অফিসারের (সিও) কাছ থেকে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ও কৌশলগত প্রস্তুতি সম্পর্কে অবহিত হন। তিনি একজন কমান্ডারের মৌখিক অপারেশনাল নির্দেশনাও মনোযোগ দিয়ে শোনেন। ঠিক যেন অবিকল বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিচ্ছবি। ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল হৃদয়ের শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম একটি আধুনিক, পেশাদার, প্রশিক্ষিত, প্রযুক্তিনির্ভর ও সুদক্ষ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্বপ্ন দেখেছিলেন। নিজের জীবদ্দশায় একটি সুশিক্ষিত ও পেশাদার বাহিনীতে রূপান্তরিত করেছিলেন বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীকে। মহান স্বাধীনতার ঘোষক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জিয়াউর রহমান আজও সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্যের হৃদয় অলিন্দে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো জ্বলজ্বল। বাবার দেখানো সেই পথেই যেন হাঁটছেন তাঁর উত্তরসূরী সন্তান তারেক রহমান।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দীর্ঘ সময় জননিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে থাকতে হয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘ মেয়াদে বেসামরিক দায়িত্ব সামরিক বাহিনীর উন্নত কঠোর প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বহি:শত্রুর আগ্রাসন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় যুদ্ধ প্রস্তুতি ও আধুনিক সমরকৌশলের মাধ্যমে দ্রুত শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানোর জন্য পুরোমাত্রায় মাঠপর্যায়ের অনুশীলন ও ফরমেশন ট্রেনিং ও সামরিক পরিবেশ বা আবহের আর কোন বিকল্প ছিল না। রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রতিরক্ষার এই প্রধান স্তম্ভটিকে নিজেদের স্বাভাবিক দায়িত্বে মনোযোগী হতে দিয়েছে তারেক রহমানের সরকার। চেনা আবহের সামরিক প্রশিক্ষণে মনোনিবেশ করেছেন বাহিনীটির সদস্যরা।

জাতির অস্তিত্ব ও মর্যাদার প্রতীক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখন দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্ষিক অনুশীলন গ্রীষ্মকালীন মহড়ায় জোর দিয়েছে। বাস্তবধর্মী যুদ্ধ কৌশল ও প্রশিক্ষণে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতি কেবল যুদ্ধের অনুশীলন প্রত্যক্ষ করাই নয় বরং সেনাসদস্যদের মনোবল বৃদ্ধি এবং কৌশলগত দক্ষতার বড় এক নিয়ামক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বহি:শত্রুর যে কোন ধরণের আক্রমণ থেকে দেশকে নিরাপদ রাখতে ঐকান্তিক মিলনের শপথেই এক সুতোয় তিনি গাঁথলেন দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ও সৈনিকদের। খোলা মাঠে বা দুর্গম এলাকায় কীভাবে সেনাসদস্যরা বাঙ্কার তৈরি করে ছদ্মবেশে অবস্থান করে এসব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলেন। প্রতিকূল পরিবেশে যুদ্ধকৌশল পরিচালনার মধ্যে দিয়ে আধুনিক ও যুগোপযোগী সেনাবাহিনী হিসেবে প্রতিটি সদস্যদের আস্থা ও বিশ্বাসে নতুন মাত্রা যোগ করার মধ্যে দিয়ে কার্যত তাদের কর্মযজ্ঞের প্রতি সম্মান জানালেন প্রধানমন্ত্রী। দামাল সেনাদের প্রস্তুতি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার মাধ্যমেও নিজের দায়িত্বশীল ও প্রজ্ঞাময় নেতৃত্বেরও স্বাক্ষর রাখলেন।

চলতি বছরের রোববার (১২ এপ্রিল) সকালে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাপ্রাঙ্গণ মিলনায়তনে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ দরবারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘আমরা এমন এক সেনাবাহিনী চাই, যাদেরকে বহিঃশক্তি সমীহ করবে, আর দেশের জনগণ রাখবে আস্থায়। পেশাদারিত্বের প্রশ্নে কোনো আপস না করে সশস্ত্র বাহিনীকে সব সময় একটি সুউচ্চ আদর্শিক অবস্থানে থাকতে হবে।’ এসবের মধ্যে দিয়ে সেদিনই দেশপ্রেমী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিয়ে নিজের ভাবনা-পরিকল্পনার পরিস্কার এক বার্তা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মানিকগঞ্জে সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হঠাৎ উপস্থিতি স্বকীয়তায় দীপ্তিমান, গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এবং অনুপ্রেরণা সঞ্চারী। গাছের পাতার আড়ালে ছদ্মবেশে অবস্থানরত সেনাসদস্যদের কাছে গিয়েও প্রধানমন্ত্রীর খোঁজখবর নেয়া ও দায়িত্ব পালনে উৎসাহ প্রদানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেটিজেনদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশংসা ও গৌরবগাথা আজ বিশ্বজুড়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এর বলিষ্ঠ ও গতিশীল নেতৃত্বে বিশ্বসভায় মর্যাদার সঙ্গেই মাথা উঁচু করে চলেছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে বিরামহীন-নিরবচ্ছিন্ন গতিতে কাজ করছেন বাংলাদেশের গর্বিত সেনারা। স্থাপন করেছেন পেশাগত দক্ষতা, সর্বোচ্চ শৃঙ্খলা, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের অনন্য নজির। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনকারী দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ। নেতৃত্বের প্রতি গভীর আস্থা, পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধাবোধ, পেশাগত দক্ষতা এবং সর্বোপরি শৃঙ্খলা সবক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ সামরিক বাহিনীর সদস্যরা রাষ্ট্র ও নেতৃত্বের প্রতি পরিপূর্ণ অনুগত থেকে কঠোর অনুশীলন ও দেশপ্রেমের সমন্বয়ে সশস্ত্র বাহিনীর গৌরব সমুন্নত রাখতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সমরশক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে চান প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সমৃদ্ধ দেশ বিনির্মাণের ব্রত নিয়ে এই সতর্ক প্রহরীর সৎ-সাহসী বিভায় উন্নয়ন আর সমৃদ্ধির পথে দুরন্ত গতিতে এগিয়ে যাবে সেনাবাহিনী। দেশপ্রেমী সেনাবাহিনী স্বর্ণালী পালকের মতো নিজেদের বহমান রাখবে সাধারণ মানুষের আস্থা, ভালোবাসা ও আত্মপ্রত্যয়ের মিলিত শক্তিতে বিশ্বস্ততার সারথি হিসেবেই। মাতৃভূমির অখণ্ডতা রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সব সময় প্রস্তুত বলে একাধিকবার পুনরুচ্চারণ করেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানও। গভীর দেশপ্রেমের পূর্ণ নির্যাসে নিজ বাহিনীর গৌরবময় ইতিহাসের মুকুট সমুন্নত রাখতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় শাশ্বত প্রায়োগিক প্রত্যয়ে তিনিও রয়েছেন নিবেদিত। গ্রীষ্মকালীন মহড়া পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আকস্মিক উপস্থিতি জানান দিলো একটি দক্ষ, আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও পেশাদার সেনাবাহিনীর রূপান্তরে সরকার মনোযোগী এবং তাঁরা প্রস্তুত দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষায়। যাদের মূলমন্ত্রই ‘সমরে আমরা শান্তিতে আমরা সর্বত্র আমরা দেশের তরে’।

কালের আলো/এম/এএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন