উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির কারণে নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সময় যত গড়াচ্ছে, পানির স্তর ততই বাড়ছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এছাড়া ঢলের পানিতে ডুবে রাজনগর উপজেলায় এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে।
শুক্রবার (১০ জুলাই) দুপুরে উজান থেকে পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় মনু নদী রক্ষা বাঁধের রাজনগর উপজেলার একামধু এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে মনু নদীর রাজনগরের উজিরপুর ও একামধু এবং কুলাউড়া উপজেলার শিকরিয়াসহ মোট তিনটি স্থানে বাঁধ ভেঙেছে।
নদী পাড়ের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রতিমুহূর্তেই পানি বাড়ছে। এভাবে পানি বাড়তে থাকলে ফসলি জমি, ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ার ব্যাপক আশঙ্কা রয়েছে। নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, বসতবাড়িতে পানি ওঠায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ। বাধ্য হয়ে অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিচ্ছেন। অনেকেই আবার নিজেদের গবাদিপশু নিয়ে মনু নদীর বাঁধে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান নিয়েছেন। মনু নদীর ভাঙনকবলিত এলাকায় পানির প্রচণ্ড চাপ দেখা গেছে। স্রোতের তীব্রতার কারণে ভাঙনের আকারও ক্রমশ বড় হচ্ছে। বেসরকারি হিসাব মতে, রাজনগর ও কমলগঞ্জ উপজেলায় অন্তত ১২ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এতে রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলার টেংরা ও পৃথিমপাশা ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে।
অন্যদিকে, কমলগঞ্জ উপজেলার মখাবিল এলাকায় ধলাই নদীর দুটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে ইসলামপুর, আদমপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামগুলো প্লাবিত হয়েছে।
এদিকে, রাজনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফরিদ উদ্দিন ভূঁইয়া ঢলের পানিতে ডুবে আকুয়া গ্রামে এক বৃদ্ধার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তার নাম-পরিচয় জানা যায়নি। তাছাড়া অতি বর্ষণের কারণে পাহাড়ি ঢল নেমে কমলগঞ্জের আদমপুর-ইসলামপুর সড়ক তলিয়ে যায় এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি প্রবেশ করেছে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, জেলার প্রধান চারটি নদীগুলোর মধ্যে মনু ও ধলাই নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। মনু নদীর রেলওয়ে এলাকায় বিপৎসীমার ৬৮ সেন্টিমিটার, মনু নদীর চাঁদনীঘাট অংশে বিপৎসীমার ৬৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে, ধলাই নদীর ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া কুশিয়ারা নদীর ২২ সেন্টিমিটার ও জুড়ী নদীর পানি বিপৎসীমার ২৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল সিকদার বলেন, যে স্থানে বাঁধ ভেঙেছে সেটা আটকানোর মতো অবস্থায় নেই। এলাকার মানুষকে মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে যাতে তারা গবাদিপশুসহ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়। যদি বৃষ্টি হয় তাহলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে জেলা প্রশাসন থেকে পাওয়া শুকনো খাবার বিতরণ করছি।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম মনু নদীর উজিরপুর এলাকার ভাঙন পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানান, পানি নেমে যাওয়ার পর বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু হবে।
তিনি আরও জানান, জেলার সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিপৎসীমার ওপর দিয়ে মনু ও ধলাই নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে মনু ও ধলাই নদীর দুটি স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙেছে। কুশিয়ারা ও জুড়ী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে মনু ও ধলাই নদীর কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। তাদের সহায়তার জন্য ৯১৫ ব্যাগ শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় আরও খাবার এবং ত্রাণ-সহায়তা দেওয়া হবে বলে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন জানিয়েছে।
কালের আলো/এসআর/এএএন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬ । ৩:৪০ অপরাহ্ণ