জুনে সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৬৩ জন: যাত্রী কল্যাণ সমিতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬ । ৫:৩৫ অপরাহ্ণ

দেশে গত জুন মাসে সড়ক, রেল ও নৌপথে মোট ৫৯০টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫১৩ জন। এর মধ্যে শুধু সড়ক দুর্ঘটনাতেই প্রাণ গেছে ৪৬৩ জনের। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবহন খাতের দায়িত্ব বিশেষজ্ঞদের হাতে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরীর স্বাক্ষরিত এক দুর্ঘটনা প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন মাসে দেশে ৫৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ৪৬৩ জন নিহত এবং এক হাজার ৩২৩ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে রেলপথে ৫৩টি দুর্ঘটনায় ৪৫ জন নিহত ও আটজন আহত হন। এ ছাড়া নৌপথে পাঁচটি দুর্ঘটনায় পাঁচজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে তিনটি খাতে ৫৯০টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫১৩ জন এবং আহত হয়েছেন এক হাজার ৩৩৬ জন।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে সংগঠনের দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তবে সংগঠনটির দাবি, অনেক দুর্ঘটনার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ না পাওয়ায় প্রকৃত হতাহত এর চেয়ে আরও বেশি হতে পারে।

মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় হাজারো মানুষের প্রাণহানি রোধে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআরটিএকে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তে দেশি-বিদেশি পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ই-প্রসিকিউশন চালু এবং যাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন মাসে ১৭২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৭৩ জন নিহত ও ১৩২ জন আহত হয়েছেন। মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩২ দশমিক ৩৩ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় নিহতের হার ৩৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং আহতের হার ৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। সেখানে ১২৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১২৬ জন নিহত ও ৩৭৩ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ বিভাগে। সেখানে ২৫টি দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত এবং ৩৫ জন আহত হয়েছেন।

দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ২২ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ১১৬ জন চালক, ৮২ জন পথচারী, ২৯ জন পরিবহন শ্রমিক, ৮৭ জন শিক্ষার্থী, ১০ জন শিক্ষক, ৫২ জন নারী, ৫৫ জন শিশু, একজন সাংবাদিক, একজন প্রকৌশলী এবং ১০ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী রয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে দুইজন পুলিশ সদস্য, একজন সেনাবাহিনীর সদস্য, একজন প্রকৌশলী, ১১১ জন চালক, ৭১ জন পথচারী, ৪৫ জন নারী, ৪৭ জন শিশু, ৬০ জন শিক্ষার্থী, ১১ জন পরিবহন শ্রমিক, ১০ জন শিক্ষক এবং নয়জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ছিলেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় জড়িত ৭৯৫টি যানবাহনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল মোটরসাইকেল, যার হার ২৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এ ছাড়া ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ডভ্যান ও লরির হার ২৫ দশমিক ২৮ শতাংশ, বাস ১৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক ১৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং বাকি অংশ অন্যান্য যানবাহন।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪৩ দশমিক ২৩ শতাংশ দুর্ঘটনা মুখোমুখি সংঘর্ষে, ২৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ গাড়িচাপা বা ধাক্কার কারণে, ২০ দশমিক ৬৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে, ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ বিভিন্ন কারণে, শূন্য দশমিক ১৮ শতাংশ ওড়না চাকায় পেঁচিয়ে এবং ১ দশমিক ১২ শতাংশ ট্রেন ও যানবাহনের সংঘর্ষে ঘটেছে।

অন্যদিকে, মোট দুর্ঘটনার ৪৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ২৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২০ দশমিক ৬৭ শতাংশ ফিডার সড়কে, ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, শূন্য দশমিক ৯৩ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে এবং ১ দশমিক ১২ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে ঘটেছে।

প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে জাতীয় মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অবাধ চলাচল, রোড সাইন ও রোড মার্কিংয়ের ঘাটতি, সড়কবাতির অভাব, মিডিয়ান না থাকা, নির্মাণ ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য, উল্টোপথে যান চলাচল, চাঁদাবাজি, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, বেপরোয়া ও বিরামহীন গাড়ি চালানো, বৃষ্টিতে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং বাস-ট্রাকের ছাদে যাত্রী পরিবহনকে দায়ী করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ১১ দফা সুপারিশ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআরটিএকে পরিবহন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা, প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক ব্যবস্থাপনা, দক্ষ চালক তৈরিতে উন্নত প্রশিক্ষণ, জাতীয় মহাসড়কে সার্ভিস লেন ও ফুটপাত নির্মাণ, সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ, চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা, রোড সাইন ও রোড মার্কিং স্থাপন, মানসম্মত সড়ক নির্মাণ, নিয়মিত রোড সেফটি অডিট, ফিটনেস সনদ প্রদানের আধুনিক ব্যবস্থা, বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি, ট্রাফিক ট্রেনিং অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা এবং পরিবহন খাতে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করা।

কালের আলো/এসআর/এএএন

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন