জুলাই অভ্যুত্থানের সময় হতাহতের ঘটনায় দায়ের হওয়া মোট মামলার ৮৬ শতাংশের তদন্ত এখনও শেষ করা সম্ভব হয়নি। মূলত সাত কারণে মামলার তদন্ত পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা ও আইনজীবীরা।
কারণগুলো হলো: এজাহারের দুর্বলতা, ভুল বর্ণনা, শত্রুতামূলক মামলা, ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফন, মামলা বাণিজ্য, বাদী ও ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎ না পাওয়া এবং ডিজিটাল প্রমাণ যাচাইয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়া। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় সারাদেশে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৮৬২টি। এরমধ্যে ২৫৪টি মামলার প্রতিবেদন হয়েছে।
তদন্ত শেষ হয়নি ১ হাজার ৬০৮ মামলার। ১৯৯টি মামলার অভিযোগপত্র হয়েছে। প্রমাণ হয়নি ৫৫টি মামলা। এখন পর্যন্ত কোনো মামলার পূর্ণাঙ্গ বিচার শুরু হয়নি। তথ্য বলছে, মোট হত্যা মামলা হয়েছে ৭৯৯টি। আসামি ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৪১ জন। এরমধ্যে ৬৫ হাজার ২১০ জন এজাহারভুক্ত আসামি। সন্দেহভাজন আসামি ২ লাখ ৬২ হাজার ৬৩১ জন।
অভিযোগপত্র হয়েছে ৬৩টি মামলার। আসামি ৫ হাজার ৭৯৩ জন। প্রমাণ হয়নি ৩৭টি মামলা। পিবিআই তদন্ত করছে ২৭৮টি, এরমধ্যে হত্যা মামলা ৮৯টি। সিআইডি তদন্ত করছে ১১৩টি মামলা। এরমধ্যে হত্যা মামলা ৬৫টি। গোয়েন্দা পুলিশ –তদন্ত করছে ৫৯টি মামলা। এটিইউ তদন্ত করছে ৫৩টি মামলা। এরমধ্যে হত্যা মামলা ৫২টি।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতায় আহত হওয়ার ঘটনায় সারাদেশে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৬৩টি। মোট আসামি ২ লাখ ৮২ হাজার ৮৭৯ জন। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত আসামি ৮৯ হাজার ১২১ জন। সন্দেহভাজন আসামি ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৫৮ জন। অভিযোগপত্র হয়েছে ১৫৪টি মামলা। আসামির সংখ্যা ১০ হাজার ২০২ জন।
পিবিআই ও বিভিন্ন থানার থানার পাশাপাশি অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), এন্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং গোয়েন্দা পুলিশও (ডিবি) মামলাগুলোর তদন্ত করছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ডিবিতে জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট ৫৯টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। প্রায় ৪০ জিবি ডাটা পর্যালোচনা করতে হচ্ছে। আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মামলাগুলোর তদন্ত করছি।’ প্রতিটি ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিলো, কে কোথায় অবস্থান করেছিলেন, কার বিরুদ্ধে কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে—এসব বিষয় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তের অংশ হিসেবে ফরেনসিক বিশ্লেষণ, ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা, ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত উপাত্ত মূল্যায়ন করা হচ্ছে,’ বলেন তিনি।
শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সঠিক তদন্ত সম্পন্ন করে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।’ পিবিআই (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) এর পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ জানান, ২৭৮টির তদন্তের ভার পিবিআইয়ের হাতে। এর মধ্যে ২০২টি মামলার তদন্ত শেষ করেছে সংস্থাটি।
নানা জটিলতার মধ্য দিয়ে তদন্ত এগোচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। কিছু মামলার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যে ভিকটিমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং যে স্থানে আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে সেখানে আসলে ভিকটিম যাননি। অথবা ভিকটিম সেখানে গেলেও আহত হননি। এসব কারণে তদন্ত পরিস্থিতি জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।’
তিনি আরও বলেন, অধিকাংশই হত্যা মামলা, সে কারণে লাশ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের ব্যাপার আছে। এসব করতেও সময়ের প্রয়োজন হয়। মেডিক্যাল সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের অনুমতির বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকায় নিম্ন আদালত ও বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া প্রায় সাড়ে ৮শ’ মামলা থেকে মাত্র ৪২টির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয়েছে বলে জানান, ঢাকা মহানগর জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী।
তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে কয়েকটি মামলা বিচারের জন্য মহানগর দায়রা জজ আদালতে এসেছে। দুটি মামলার চার্জ শুনানিও শুরু হয়েছে। দেখা যাচ্ছে মামলায় নির্দোষ ব্যক্তি যেমন আসামি হয়েছেন, তেমনি দোষী ব্যক্তিও বাদ পড়েছেন। অর্থাৎ সমন্বয়হীনতা ছিলো। তবে তদন্ত কর্মকর্তার বিশাল ক্ষমতা। সঠিক তদন্তে তিনি সবকিছু বের করতে পারবেন।’
কালের আলো/এম/এএইচ

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬ । ৩:০৩ অপরাহ্ণ