ত্রিনিদাদের ব্রায়ান লারা ক্রিকেট একাডেমি স্টেডিয়ামে রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের প্রত্যাশা থাকলেও চতুর্থ দিনের শেষ সেশনে ব্যাটিং ধস নামিয়ে বড় হতাশার জন্ম দিয়েছে পাকিস্তান। ২১১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ১২০ রানে অলআউট হয়ে ৯০ রানের ব্যবধানে হেরেছে সফরকারীরা। এই জয়ে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
চতুর্থ দিনের উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য কিছুটা কঠিন হয়ে উঠলেও ২১১ রানের লক্ষ্য মোটেও অসম্ভব ছিল না। তবে ক্যারিবিয়ান পেসারদের দারুণ নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে শুরু থেকেই দিশেহারা হয়ে পড়ে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ। মাত্র ৭১ রানেই ৯ উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে কার্যত ছিটকে যায় তারা।
শেষ উইকেটে বাবর আজম ও মোহাম্মদ আব্বাস ৪৯ রানের লড়াকু জুটি গড়ে পাকিস্তানকে কোনোভাবে তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছে দেন। কিন্তু ততক্ষণে পরাজয় নিশ্চিত হয়ে গেছে। ৪০.২ ওভারে মাত্র ১২০ রানে গুটিয়ে যায় পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংস।
পুরো ইনিংসে পাকিস্তানের হয়ে একমাত্র প্রতিরোধ গড়েন সাবেক অধিনায়ক বাবর আজম। তিন নম্বরে নেমে ধৈর্য ও দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে অপরাজিত ৫৮ রান করেন তিনি। তবে অন্য প্রান্ত থেকে কোনো সমর্থন পাননি।
দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৩ রান আসে ১১ নম্বরে ব্যাট করতে নামা পেসার মোহাম্মদ আব্বাসের ব্যাট থেকে। উইকেটরক্ষক মোহাম্মদ রিজওয়ান করেন মাত্র ১১ রান। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা অধিনায়ক শান মাসুদ ভাঙা আঙুল নিয়েই ব্যাট করতে নামলেও করতে পারেন মাত্র ৩ রান।
পাকিস্তানের ব্যাটিং ধসের নায়ক জেডন সিলস। দুর্দান্ত লাইন-লেংথে বোলিং করে মাত্র ২০ রানে ৫ উইকেট তুলে নেন তিনি। জাস্টিন গ্রিভস নেন ২ উইকেট, অভিজ্ঞ কেমার রোচও শিকার করেন ২টি উইকেট।
আগের দিন পাকিস্তানের প্রথম ইনিংসে টানা পাঁচ ওভার মেডেন দিয়ে প্রতিটি ওভারেই উইকেট নিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন গ্রিভস। চতুর্থ দিনও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নিজের প্রথম দুই ওভারেই দুটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নেন।
এই ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো টেস্ট ইতিহাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সব ২০টি উইকেটই নিয়েছেন তাদের পেসাররা।
দিনের শুরুতে অষ্টম উইকেটে ৩৩ রানের জুটি নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কেমার রোচ ও শামার জোসেফ আরও কিছু মূল্যবান রান যোগ করে দলকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যান।
উইকেটরক্ষক মোহাম্মদ রিজওয়ান একটি সহজ ক্যাচ ফেললেও ৩৮ রান করা শামার জোসেফকে শেষ পর্যন্ত ফিরিয়ে দেন পাকিস্তানের বোলাররা। শেষ দুটি উইকেটে আরও ২৭ রান যোগ করে ১৮১ রানে অলআউট হয় স্বাগতিকরা।
পাকিস্তানের হয়ে দুর্দান্ত বোলিং করেন মোহাম্মদ আব্বাস। তিনি মাত্র ২২ রানে ৫ উইকেট শিকার করেন। এছাড়া মির হামজা আলী ২টি এবং শাহজাদ নেন ২টি উইকেট।
বিশেষ একটি রেকর্ডও গড়েছে পাকিস্তানের পেস আক্রমণ। ১৯৯৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারারে টেস্টের পর এই প্রথম কোনো টেস্টে প্রতিপক্ষের সব ২০টি উইকেটই নেন পাকিস্তানের পেসাররা। তবে বোলারদের সেই সাফল্যকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন ব্যাটাররা।
এই পরাজয়ের ফলে টানা চতুর্থ টেস্টে হারল পাকিস্তান। সর্বশেষ ১৭টি টেস্টের মধ্যে তারা হেরেছে ১৩টিতে। বিদেশের মাটিতে এটি তাদের টানা অষ্টম টেস্ট হার, যা পাকিস্তানের টেস্ট ইতিহাসে নতুন নেতিবাচক রেকর্ড।
ঘরের বাইরে পাকিস্তান সর্বশেষ টেস্ট জিতেছিল ২০২৩ সালের জুলাইয়ে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। এরপর থেকে বিদেশের মাটিতে জয় অধরাই রয়ে গেছে তাদের।
দুই ম্যাচের সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট আগামী রোববার পোর্ট অব স্পেনে অনুষ্ঠিত হবে। সিরিজে সমতা ফেরাতে হলে সেই ম্যাচে জয়ের বিকল্প থাকবে না বাবর আজমদের সামনে।
এই ম্যাচে আরেকটি বিরল রেকর্ডও গড়া হয়েছে। টেস্ট ইতিহাসে মাত্র পঞ্চমবারের মতো এক ম্যাচে দুই দলের পেসাররা মিলেই নিয়েছেন ৪০টি উইকেট। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে এমন ঘটনা এই প্রথম।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য জয়টি আরও বিশেষ। সর্বশেষ ১১ টেস্টে এটি তাদের মাত্র দ্বিতীয় জয়। তাছাড়া কিংবদন্তি স্যার গারফিল্ড সোবার্সের জন্মদিনে পাওয়া এই জয় তাঁকে উৎসর্গ করেছেন অধিনায়ক রোস্টন চেজ।
ম্যাচ শেষে চেজ বলেন, “এই টেস্ট জিততে পেরে আমরা খুবই আনন্দিত। কয়েক দিন আগে প্রয়াত কিংবদন্তি স্যার গারফিল্ড সোবার্সের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা এই জয় তাঁকে উৎসর্গ করছি। ম্যাচের আগেই আমরা এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম। আশা করি, ওপর থেকে তিনি আমাদের এই জয় দেখে হাসছেন। পাশাপাশি ত্রিনিদাদের দর্শকদেরও ধন্যবাদ জানাই, যারা মাঠে এসে আমাদের দারুণ সমর্থন দিয়েছেন।”
সংক্ষিপ্ত স্কোর
ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ৩১১ ও ১৮১
পাকিস্তান: ২৮২ ও ১২০
ফল: ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৯০ রানে জয়ী।
ম্যাচসেরা: জাস্টিন গ্রিভস (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)
সিরিজ: দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
কালের আলো/এসএ

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬ । ১২:০৮ অপরাহ্ণ