বিশ্বকাপে মেসি সহ তারকা ফুটবলার-রেফারিদের ওপর হুমকির ঝড়

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬ । ৩:৪৬ অপরাহ্ণ

বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে প্রায় তিন সপ্তাহ। মাঠের উত্তেজনা, গ্যালারির উন্মাদনা আর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দ এখনো ফুটবলপ্রেমীদের মনে টাটকা। কিন্তু সেই উৎসবের আড়ালে পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ ছিল, তার অনেকটাই এত দিন ছিল অপ্রকাশ্য।

সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা পুলিশের অভ্যন্তরীণ নথিতে উঠে এসেছে বিশ্বকাপের সময় খেলোয়াড়, কোচ, রেফারি ও দলগুলোর ওপর নানা ধরনের হুমকি ও হয়রানির তথ্য। নথিগুলো আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতা কেন্দ্র (আইপিসিসি)–এর নিরাপত্তা কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআইয়ের নেতৃত্বে আইপিসিসিতে ৪০টির বেশি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কাজ করেছিলেন।

মজার বিষয় হলো, এফবিআই পরে জানিয়েছিল বিশ্বকাপের ৩৯ দিনের আয়োজনে বড় কোনো নিরাপত্তা ঘটনা ঘটেনি। প্রায় ৫ হাজার এফবিআই সদস্য এবং ৫৯টি হোমল্যান্ড সিকিউরিটি টাস্কফোর্স নিরাপত্তায় কাজ করেছিল। কিন্তু প্রকাশিত নথি দেখাচ্ছে, বড় কোনো হামলা না ঘটলেও হুমকি ও সন্দেহজনক ঘটনার চাপ ছিল যথেষ্ট।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, টুর্নামেন্টের আগে ও চলাকালে সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়া ফুটবলারদের একজন ছিলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি।

আর্জেন্টিনা–জর্ডান ম্যাচের আগে ডালাস বিমানবন্দরে পুলিশকে ফোন করে এক ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি আরও দুজনকে নিয়ে হাতে তৈরি বোমা ও একটি এআর-১৫ রাইফেল নিয়ে স্টেডিয়ামের দিকে যাচ্ছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ব্যক্তির বক্তব্যে মেসিকে লক্ষ্য করার বিষয়টি স্পষ্ট ছিল।

এরপর আর্জেন্টিনা–মিসর ম্যাচের আগেও মেসিকে নিয়ে ভয়ংকর হুমকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একজন ব্যবহারকারী স্টেডিয়ামে ঢুকে মেসিকে হামলার লক্ষ্য বানানোর কথা লেখেন। একই ম্যাচ চলাকালে স্টেডিয়ামের কয়েকটি ডাস্টবিনে বোমা রাখা হয়েছে—এমন ফোনও আসে পুলিশের কাছে। পরে বিস্ফোরক শনাক্তকারী দল ও প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে স্টেডিয়ামে তল্লাশি চালানো হয়।

বিশ্বের আরেক মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকেও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হয়েছে।

এক সন্দেহভাজন ব্যক্তি পর্তুগাল দলের হোটেল ও রোনালদোর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ তাঁকে শনাক্ত করে। হিউস্টনে দলটির হোটেল থেকে ওই ব্যক্তিকে আটক করা হয়।

টরন্টোতেও এক ভক্ত রোনালদোর সঙ্গে লিফটে ঢোকার চেষ্টা করেন। নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে থামিয়ে দেন। পরে ওই ব্যক্তি জানান, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল শুধু রোনালদোর সঙ্গে ছবি তোলা। মায়ামিতেও রোনালদোকে ঘিরে ভক্তদের অতিরিক্ত আগ্রহের ঘটনা ঘটে। এমনকি পর্তুগাল–ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে রোনালদোর জার্সি পরা এক দর্শক মাঠে ঢুকে পড়েছিলেন।

বিশ্বকাপে নিরাপত্তা-ঝুঁকির আরেকটি দিক ছিল খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে অনলাইন হুমকি। ম্যাচে ভুল করা বা প্রতিপক্ষের সঙ্গে বিতর্কে জড়ানোর পর কয়েকজন ফুটবলারকে সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।

নরওয়ের স্ট্রাইকার আলেকজান্ডার সরলথ গোলের সহজ সুযোগ নষ্ট করার পর তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রীকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। কলম্বিয়ার জামিনটন ক্যাম্পাজও পেনাল্টি মিসের পর হুমকির মুখে পড়েন।

ফ্রান্সের লুকাস দিনিয়ে স্পেন–ফ্রান্স ম্যাচে লামিনে ইয়ামালকে ফাউল করে পেনাল্টি দেওয়ার পরও অনলাইনে ভয়ংকর হুমকি পান বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

কিলিয়ান এমবাপ্পেকেও বিশ্বকাপে মাঠের বাইরের চাপ সামলাতে হয়েছে। প্যারাগুয়ের গোলরক্ষকের সঙ্গে মাঠে উত্তপ্ত পরিস্থিতির পর তাঁকে ঘিরে দেশটিতে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর প্রতিকৃতি পোড়ানোর ঘটনাও ঘটে, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এ ধরনের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা শুধু স্টেডিয়ামের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না। অনলাইন বিদ্বেষ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হুমকি এবং মাঠের পারফরম্যান্স নিয়ে আবেগও কখনো বাস্তব নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর দক্ষিণ কোরিয়া দলও ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। কোচ হং মিয়ং-বো এবং দলের সদস্যদের উদ্দেশে হত্যার হুমকি দেওয়া হলে তাদের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। বিমানবন্দর পর্যন্ত দলটিকে পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে নিয়ে যেতে হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে হুমকির মাত্রার দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ার।

আর্জেন্টিনা–মিসর ম্যাচ পরিচালনার পর তাঁর ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে প্রায় ছয় হাজার হুমকিমূলক বার্তা পাঠানো হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এসব বার্তার বড় অংশই ছিল মিসরীয় নাগরিকদের কাছ থেকে।

ম্যাচটির ভিএআর কর্মকর্তা উইলি দেলাজোদও হুমকির শিকার হন। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে ফ্রান্সে লেতেক্সিয়ার ও দেলাজোদের বাড়ি এবং পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।

বিশ্বকাপের নিরাপত্তা নিয়ে এফবিআইয়ের সরকারি মূল্যায়ন ছিল ইতিবাচক। সংস্থাটি জানিয়েছে, টুর্নামেন্টে কোনো বড় ধরনের নিরাপত্তা ঘটনা ঘটেনি এবং যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে লাখ লাখ দর্শক, খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাকে নিরাপদে রাখতে ব্যাপক গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় করা হয়েছিল।

কিন্তু এখন প্রকাশিত এসব নিরাপত্তা-তথ্য দেখাচ্ছে, বড় কোনো হামলা না ঘটার পেছনে নিরাপত্তা বাহিনীর সতর্কতা ও দ্রুত পদক্ষেপের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে বিশ্বকাপ যতটা ছিল উৎসবের, নিরাপত্তার দিক থেকে তার আড়ালের ছবিটা ছিল অনেক বেশি উদ্বেগজনক।

তারকা ফুটবলার থেকে রেফারি—কারও কাছেই হুমকি থামেনি। আর এসব ঘটনা আরও একবার মনে করিয়ে দিয়েছে, কোটি কোটি মানুষের আবেগের কেন্দ্রে থাকা একটি বৈশ্বিক ক্রীড়া আয়োজনের নিরাপত্তা কতটা কঠিন ও জটিল হয়ে উঠেছে।

কালের আলো/এসএ 

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন