মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের দাপটে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাচ্ছে—এমন আলোচনা বহুদিনের। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু আয়োজন যেন সেই ধারণায় নতুন প্রশ্ন তুলছে। তরুণদের অংশগ্রহণে সাহিত্য উৎসব, লেখালেখির কর্মশালা, বই পড়ার কর্মসূচি ও ক্যাম্পাসভিত্তিক সাহিত্য আয়োজন বাড়ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—ডিজিটাল যুগে তরুণরা কি আবার সাহিত্য ও বইয়ের কাছে ফিরছে?
গত ৮ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘হৃদয়ে সাহিত্য’-এর প্রথম বার্ষিক সাহিত্য উৎসব। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা, পাঠাভ্যাস, সৃজনশীলতা এবং নবীন লেখক তৈরির লক্ষ্যেই আয়োজনটি করা হয়।
শুধু এই একটি আয়োজন নয়, চলতি বছর তরুণদের কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বই পড়া ও সাহিত্যচর্চার নানা উদ্যোগ দেখা গেছে। জুনে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বছরব্যাপী বই পড়া কার্যক্রম শেষে ১৪৫ জন পাঠক-শিক্ষার্থীকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। এর মধ্যে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ছিলেন।
তরুণদের কাছে সাহিত্য উৎসব এখন কেবল বই কেনাবেচা বা কবিতা শোনার জায়গা নয়। লেখকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, কবিতা পাঠ, গল্প লেখা, আলোচনা, কর্মশালা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা—সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে একটি সামাজিক অভিজ্ঞতা।
এই পরিবর্তনটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাহিত্যচর্চার সুযোগ থাকলেও সেখানে পাঠকের সঙ্গে লেখকের সম্পর্ক অনেক সময় ভার্চুয়াল পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে। সাহিত্য উৎসব সেই সম্পর্ককে নিয়ে আসে সামনাসামনি পরিসরে।
তরুণদের জন্য তাই একটি সাহিত্য উৎসব একই সঙ্গে বই, বন্ধুত্ব, সৃজনশীলতা ও নিজের ভাবনা প্রকাশের জায়গা হয়ে উঠছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অনেক সময় বই পড়ার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবতা কিছুটা ভিন্নও হতে পারে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব বা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বইয়ের আলোচনা, লেখকের সাক্ষাৎকার, কবিতা পাঠ কিংবা বইয়ের রিভিউ তরুণদের নতুন বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।
অর্থাৎ যে তরুণের হাতে সারাক্ষণ স্মার্টফোন, তিনিই আবার সেই ফোনের মাধ্যমে কোনো লেখক বা বই সম্পর্কে জানতে পেরে বই কিনতে পারেন, সাহিত্য অনুষ্ঠানে যেতে পারেন কিংবা নিজেই লিখতে শুরু করতে পারেন।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের দীর্ঘদিনের পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচিতেও বই পড়ার মাধ্যমে কিশোর-তরুণদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তরুণদের সাহিত্য উৎসবমুখী হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করতে পারে।
প্রথমত, নিজের কথা বলার জায়গার প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবাই কথা বললেও গভীরভাবে নিজের চিন্তা প্রকাশের সুযোগ সীমিত। সাহিত্য সেই জায়গাটি তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, মানসিক বিরতি।
সারাক্ষণ নোটিফিকেশন, ভিডিও ও দ্রুত বদলে যাওয়া কনটেন্টের মধ্যে বই পড়া অনেকের কাছে মনোযোগ ধরে রাখার আলাদা অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
তৃতীয়ত, কমিউনিটি।
একই ধরনের বই পড়েন বা লেখালেখি করেন—এমন মানুষের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার সুযোগ তরুণদের সাহিত্য আয়োজনের প্রতি আগ্রহী করে তুলছে।
চতুর্থত, নতুন লেখক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
এখন প্রকাশের সুযোগ আগের চেয়ে অনেক বেশি। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে লেখা প্রকাশের পাশাপাশি সাহিত্য উৎসব ও লেখালেখির কর্মশালা তরুণদের নিজেদের লেখাকে আরও পরিণত করার সুযোগ দিচ্ছে।
এর উদাহরণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্ক্রিপ্টোরিয়া ন্যাশনাল লিটারারি ফেস্ট’-এর কথাও বলা যায়। সেখানে প্রবন্ধ, গল্প ও গবেষণা প্রস্তাবনা নিয়ে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি কর্মশালা, প্যানেল আলোচনা ও সাহিত্যকেন্দ্রিক বিভিন্ন আয়োজন রাখা হয়েছিল।
এখানেই কিছুটা সতর্ক হওয়া দরকার। কয়েকটি সাহিত্য উৎসবে তরুণদের বড় উপস্থিতি দেখেই সার্বিকভাবে বলা যায় না যে দেশের তরুণদের বই পড়ার অভ্যাস ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।
বরং বলা যায়, সাহিত্যকে তরুণদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ধরন বদলাচ্ছে। বইয়ের পাশাপাশি আলোচনা, উৎসব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, লেখকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং সৃজনশীল কর্মশালা—সব মিলিয়ে সাহিত্যচর্চার নতুন পরিসর তৈরি হচ্ছে।
জুলাইয়ে শ্রীমঙ্গলে আয়োজিত ‘বই পড়া উৎসব’-এর লক্ষ্যও ছিল মোবাইল ফোননির্ভর প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করা।
সম্ভবত পুরো বিষয়টিকে এভাবেই দেখা যায়। আগে সাহিত্যচর্চাকে অনেক তরুণের কাছে একাকী বা একাডেমিক বিষয় মনে হতে পারে। এখন সেটিই উৎসব, আড্ডা, সৃজনশীলতা ও সামাজিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
ফলে বই শুধু তাকের ওপর রাখা একটি বস্তু নয়; সেটিকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে কমিউনিটি ও অভিজ্ঞতা।
ডিজিটাল বিনোদনের এই সময়ে তরুণরা হয়তো প্রযুক্তি থেকে দূরে সরে সাহিত্যে ফিরছে না। বরং প্রযুক্তিকে সঙ্গে নিয়েই সাহিত্যের কাছে নতুনভাবে ফিরছে।
আর সেই কারণেই সাহিত্য উৎসবের ভিড়কে শুধু একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনের দর্শকসংখ্যা হিসেবে না দেখে, তরুণ প্রজন্মের চিন্তা, পরিচয় ও সৃজনশীলতার পরিবর্তিত অভ্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
কালের আলো/এসএ

সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬ । ৪:০৮ অপরাহ্ণ