কালের আলো/এএএন/এমডিএইচ
স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারাল বাংলাদেশ। এ যেন অবিশ্বাস্য! তাও আবার ৯ উইকেটের দাপুটে ব্যবধানে জয়! ম্যাচজুড়ে ছিল বাংলাদেশের আধিপত্য। টানা ১১টি সেশন অস্ট্রেলিয়াকে নাস্তানাবুদ করে নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে লিখে ফেলল এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এমন জয়—বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য নিঃসন্দেহে বিশেষ এক মুহূর্ত। উল্লাসে মেতেছে দেশ। উচ্ছ্বসিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয় নিয়ে উচ্ছ্বাসের মধ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেছেন তিনি। রোববার (১৬ আগস্ট) সরকারি সফরে কিশোরগঞ্জ যাওয়ার পথে বাংলাদেশ দলের জয়ের খবর পেয়ে খেলোয়াড়দের সঙ্গে ভিডিও কলে যুক্ত হন প্রধানমন্ত্রী।
ক্রিকেট ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়
- দুই ইনিংসে মোট ৯ উইকেট নেয়া হাসান মাহমুদ ম্যাচসেরা
- মিরাজ জানালেন ঐতিহাসিক এই জয়ের পেছনের গল্প
ঐতিহাসিক জয়ের আনন্দকে আরও রাঙিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে শ্রীলঙ্কা কখনোই টেস্টে জয়ের মুখ দেখেনি, পাকিস্তান সবশেষ জেতে ১৯৯৫তে। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসের ইতি টানেন মেহেদী হাসান মিরাজ। ২০১৯ সালে ভারতীয় স্পিনার কুলদীপ যাদবের পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম সফরকারী স্পিনার হিসেবে ৫ উইকেট তুলে নেন এ টাইগার ক্রিকেটার। ২৮৪ রানে অলআউট হয় স্বাগতিকরা। ৩ উইকেট নেন আগের ইনিংসে ৬ উইকেট নেয়া হাসান মাহমুদ। ডারউইনে ইতিহাস গড়তে বাংলাদেশ লক্ষ্য পায় ৫৭ রানের। এর আগে দারুণ এক সেঞ্চুরি তুলে নেন ক্যামেরন গ্রিন (১০৪)।
প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে বাংলাদেশ থামে ৪২৬ রানে, লিড পায় ২২৮ রানের। দারুণ এক সেঞ্চুরি তুলে নেন তানজিদ হাসান তামিম (১০১)। ৮৪ রান আসে অধিনায়ক নাজমুল হাসান শান্তর ব্যাট থেকে। ৬৫ ও ৪৯ রান করেন যথাক্রমে মিরাজ ও মুমিনুল। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৬ উইকেট নেন জশ হ্যাজেলউড। নিজেদের প্রথম ইনিংসে হাসান মাহমুদের তোপে একে একে সাজঘরে ফিরে যান স্বাগতিক দলের ব্যাটাররা। ৬ উইকেট তুলে নেন এ টাইগার পেসার। ২টি করে নেন তাসকিন আহমেদ ও ইবাদত হোসেন। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সর্বোচ্চ ৭১ রান করেন স্টিভেন স্মিথ। আর কেউ ২৫ রানও করতে পারেননি। দুই ইনিংসে মোট ৯ উইকেট নেয়া হাসান মাহমুদ ম্যাচসেরা।
মিরাজ জানালেন ঐতিহাসিক এই জয়ের পেছনের গল্প
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দীর্ঘ ২৩ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে ডারউইনে ইতিহাস গড়লো বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। স্বাগতিকদের বিপক্ষে এই অবিশ্বাস্য টেস্ট জয়ের পর অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ জানালেন ঐতিহাসিক এই জয়ের পেছনের গল্প। অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ও অ্যালিসা হিলির মুখোমুখি হয়ে মিরাজ তুলে ধরেন দলের অদম্য আত্মবিশ্বাস ও লড়াইয়ের মানসিকতা। প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়ে ইনিংস ব্যবধানে হারের ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়ানো সহজ ছিল না। তবে সেই ব্যর্থতাই হয়ে ওঠে ঘুরে দাঁড়ানোর জ্বালানি। মিরাজের বলেন, ‘প্রস্তুতি ম্যাচ হারের পর ভাবতে হয়েছে কীভাবে কী করা যায়। আমাদের সবার জন্য দারুণ একটা সুযোগ ছিল। বার্তা একটাই ছিল- আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে, না হলে বেশি দূর যেতে পারব না।’
এই শতাব্দীর এশিয়ার দ্বিতীয় দল হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয়ের পথে ব্যাট ও বল হাতে সামনে থেকেই নেতৃত্ব দেন মিরাজ। প্রথম ইনিংসে বিপর্যয়ের মুখে টেলএন্ডারদের নিয়ে দারুণ এক জুটিতে মূল্যবান ৬৫ রান করেন তিনি। আর দ্বিতীয় ইনিংসে তুলে নেন ৫ উইকেট। ২০১৯ সালে ভারতীয় স্পিনার কুলদীপ যাদবের পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম সফরকারী স্পিনার হিসেবে ফাইফার নেন এ টাইগার ক্রিকেটার। নিজের কৃতিত্ব সতীর্থদের উৎসর্গ করে মিরাজ আরও বলেন, ‘শেষের ব্যাটসম্যানরা আমাকে সুযোগ করে দিয়েছে। আমি শুধু তাদের বলেছিলাম টিকে থাকতে এবং বোলার কে তা না ভেবে শুধু বলের মেধা অনুযায়ী খেলতে।’
ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্সের প্রশংসা করে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চমৎকার ক্রিকেট খেলেছি। সঠিক সময়ে ভালো ব্যাটিং ও বোলিং করেছি। তানজিদ তামিম, শান্ত ও মুমিনুল খুব ভালো ব্যাট করেছে।’ এই অবিস্মরণীয় জয়ে দেশের মানুষের উচ্ছ্বাসে ভাসছেন মিরাজ ও তার সতীর্থরা। ম্যাচ শেষে বাংলাদেশি সমর্থকদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের সবাই খুব খুশি। এটা খুব গর্বের একটা মুহূর্ত। অনেক বাংলাদেশি এখানেও এসেছে, যারা আমাদের বিশ্বাস করেছিল। এই শতাব্দীতে এমন কীর্তি আমাদের ক্রিকেটের জন্য অনেক বড় এক প্রাপ্তি।’
ক্রিকেটারদের সেই ঐতিহাসিক জয়ের আনন্দকে আরও রাঙিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী
ক্রিকেটারদের সেই ঐতিহাসিক জয়ের আনন্দকে আরও রাঙিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী। ঐতিহাসিক জয়ের পরই বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে ভিডিও গ্রুপ কলে যুক্ত হন তিনি। ভিডিও কলে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি তামিম ইকবাল খানও। ভিডিও কলে ক্রিকেটারদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি তাদের শারীরিক অবস্থারও খোঁজ নেন প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘ ও কঠিন টেস্ট শেষে ক্রিকেটারদের ক্লান্তির কথাও মাথায় ছিল তাঁর। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে অপেক্ষা করছি আপনাদের ওয়েলকাম করার জন্য। বাংলাদেশের মানুষ অপেক্ষা করছে।’
ক্রিকেটারদের সুস্থভাবে দেশে ফেরার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী দলের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সময় তানজিদ হাসানের প্রসঙ্গও আসে। বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল তাকে ‘বগুড়ার ছেলে’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বগুড়ার না, ও বাংলাদেশের ছেলে। সে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করছে, বগুড়াকে না।’ তানজিদকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ও বালাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করছে, বগুড়াকে না।’
এরপর ক্রিকেটারদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে অপেক্ষা করছি আপনাদের স্বাগত জানানোর জন্য।’ এরপর প্রধানমন্ত্রী অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকে খুঁজেন। তিনি শান্তকে জিজ্ঞেস করেন, ‘সবার শরীর ভালো আছে তো? টাইগার কাপ্তান উত্তর দেন, ‘ক্লান্ত সবাই।’ তখন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটু (ক্লান্তি) হবে স্বাভাবিক। গরম কেমন ওখানে?’ তখন ক্রিকেটাররা বলেন, ‘অনেক গরম।’ প্রধানমন্ত্রী তখন উত্তর দেন, ‘ভালো গরম! দেশের মতো! আচ্ছা, আসেন আপনারা সুস্থভাবে। বাংলাদেশের মানুষ আপনাদের ওয়েলকাম করতে অপেক্ষা করছে।’

ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬ । ৩:১২ পূর্বাহ্ণ