ব্যাংকে উদ্বৃত্ত তারল্যের রেকর্ড ঋণের চাহিদা কম, বিনিয়োগে স্থবিরতা; এক মাসে বাড়ল ৭১ হাজার কোটি

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬ । ৬:৫৮ অপরাহ্ণ

ব্যবসা-বিনিয়োগে ধীরগতি, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর সতর্কতার কারণে দেশের ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত জুন শেষে প্রথমবারের মতো ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। মে শেষে এর পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, মাত্র এক মাসে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে ৭১ হাজার কোটি টাকা।

এক বছর আগে, ২০২৫ সালের জুনে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। আর ২০২৪ সালের জুনে ছিল ১ লাখ ৯৩ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের জুনে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ, কয়েক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে অব্যবহৃত তারল্য দ্রুত বেড়েছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং অনিশ্চিত ব্যবসায়িক পরিবেশের কারণে নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কমেছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ বিতরণে ঝুঁকি নিতে চাইছে না।

এর প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে। বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে। ফলে ব্যাংকে অর্থ থাকলেও তা উৎপাদনশীল খাতে পর্যাপ্তভাবে প্রবাহিত হচ্ছে না।

এদিকে, মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের একটি অংশ আবার ব্যাংকে ফিরতে শুরু করেছে। তবে আমানতের বড় অংশ যাচ্ছে অপেক্ষাকৃত ভালো ও নির্ভরযোগ্য ব্যাংকগুলোতে। এসব ব্যাংকও নতুন ঋণ বিতরণের বদলে ঝুঁকি কম এমন সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে অর্থ বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী।

তবে উদ্বৃত্ত তারল্যের পুরোটা ব্যাংকের হাতে নগদ অর্থ হিসেবে পড়ে নেই। এর বড় অংশ বিভিন্ন বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা থাকে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোকে তলবি ও মেয়াদি দায়ের ১৩ শতাংশ এসএলআর এবং ৪ শতাংশ সিআরআর হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। এর অতিরিক্ত অর্থই উদ্বৃত্ত তারল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রয়োজন হলে বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করা অর্থ দ্রুত নগদায়ন করা সম্ভব।

ঋণের চাহিদা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক গত মে মাসে কম সুদের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ করা হয়েছে। সম্প্রতি ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশে সীমিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে এসব উদ্যোগের পরও ঋণের চাহিদায় এখনো প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি।

করোনার সময়ও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সে সময় ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ১২টি প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ৯৪ হাজার ২৫০ কোটি টাকা বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপরও ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। ফলে ২০২১ সালের শেষে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে ২ লাখ ৩১ হাজার ৭১১ কোটি টাকায় উঠেছিল, যা তখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল।

ব্যাংকারদের আশঙ্কা, ব্যাংকে বিপুল অর্থ পড়ে থাকলেও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না বাড়লে এর সুফল অর্থনীতিতে পাওয়া যাবে না। বরং দীর্ঘদিন ঋণের চাহিদা কম থাকলে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তাদের মতে, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, অবকাঠামো ও ব্যবসায়িক পরিবেশের অনিশ্চয়তা দূর না হলে উদ্যোক্তাদের ঋণ নেওয়ার আগ্রহ সহজে ফিরবে না। ফলে ব্যাংক খাতে বাড়তে থাকা উদ্বৃত্ত তারল্য এখন শুধু স্বস্তির খবর নয়; অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা ফেরানোর প্রয়োজনীয়তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

কালের আলো/এম/এএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন