মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির পারফরম্যান্সে ‌‘সন্তুষ্ট’ প্রধানমন্ত্রী

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশের সময়: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬ । ১০:১৪ অপরাহ্ণ

মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনিকে আরও এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠনের মাত্র একদিন আগে সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) ২৬তম মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে তাকে নিয়োগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি সরকারের প্রথম ৬ মাস এই পদে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে শেষ হয় তাঁর দুই বছরের চুক্তির মেয়াদ। তবে আগে থেকেই গুঞ্জন ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নতুন কাউকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে বেছে নিচ্ছেন না। নতুন সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে সফলভাবে দেশ চালানোর ক্ষেত্রে ১৮০ দিনে কর্মদক্ষতার পরিচয় দেওয়া নাসিমুল গনিকেই তিনি চুক্তিতে রাখছেন।

সোমবার (১৭ আগস্ট) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এই সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন তাঁর বিষয়ে সরকারপ্রধানের মূল্যায়ন পরিস্কার। যা নাসিমুল গনির ওপর প্রধানমন্ত্রীর গভীর আস্থাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখার এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে-সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৯ ধারা অনুযায়ী ড. নাসিমুল গনি (পরিচিতি নম্বর-৩১০৭)-কে অন্য যেকোনো পেশা এবং সরকারি, আধা-সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান/সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে এক বছর মেয়াদে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে পূর্বের চুক্তির ধারাবাহিকতায় পুন:চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়, মাঠ প্রশাসনের তদারকি এবং প্রশাসনিক সংস্কারের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে এই পদের ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। চাকরি জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও অতীতেও বিএনপি সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজের সুযোগ পেয়েছেন ড.নাসিমুল গনি। বর্তমান প্রশাসন ক্যাডারেও একজন দক্ষ, অভিজ্ঞ, সৎ, পেশাদার ও যোগ্য কর্মকর্তা হিসেবে সরকারের পছন্দের তালিকার অগ্রভাগে ছিলেন তিনি। প্র্রশাসনের সর্বোচ্চ এই কর্মকর্তা সরকারের প্রথম ৬ মাসে ক্যাবিনেট সেক্রেটারি পদের মর্যাদা ও ওজনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কর্মদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। গতিশীল ও কার্যকর প্রশাসন গড়তে তাঁর পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট হয়েই পুনরায় ১৯৮২ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের এই কর্মকর্তার ওপরেই আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

  • ১৮০ দিনে কর্মদক্ষতার পরিচয় দেওয়া নাসিমুল গনিকেই এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ
  • দক্ষ, অভিজ্ঞ, সৎ, পেশাদার ও যোগ্য কর্মকর্তা হিসেবে সরকারের পছন্দের তালিকার অগ্রভাগে ছিলেন
  • অতীতেও বিএনপি সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজের সুযোগ পেয়েছেন

একজন নাসিমুল গনির শিক্ষা ও চাকরি জীবন বেশ বর্ণাঢ্য। ছিলেন মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্র। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯১ ও ২০০১ সালের সরকারের মেয়াদে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে ছিলেন ভূমি মন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত সচিব। ১৯৯৫ সালে তাঁকে বাংলাদেশ দূতাবাস, বাগদাদ, ইরাকে প্রথম সচিব (শ্রম) পদে নিয়োগ করা হয়। এক বছর পর তাঁকে বাগদাদ থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। দেশে ফেরার পর তাঁকে ভোলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদে নিয়োগ করা হয় এবং পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদে বদলী করা হয়। ১৯৯৯ সালে তাঁকে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক পদে নিয়োগ করা হয়। ২০০০ সালে তিনি উপসচিব পদে পদোন্নতি লাভ করেন। জামালপুরের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে তাকে জাতীয় সংসদের স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের একান্ত সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০০৪ সালে তিনি যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি লাভ করেন এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে যুগ্মসচিব হিসেবে কাজ করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক ও পরবর্তীতে বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সালে তিনি অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি লাভ করেন এবং তাঁকে রাষ্ট্রপতির একান্ত সচিব পদে নিয়োগ করা হয়। ২০০৭ সালে তাঁকে নিপোর্টের মহাপরিচালক পদে পদায়ন করা হয়।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। ওই সময় প্রথমে তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। চার বছর ওএসডি থাকার পর ২০১৩ সালে তাঁকে চাকরি থেকে অবসর প্রদান করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তবর্তীকালীন সরকার নাসিমুল গনিকে সিনিয়র সচিব পদমর্যাদায় জন বিভাগ, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান করেন। তিনি ওই বছরের ১৮ আগস্ট সিনিয়র সচিব হিসেবে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে যোগদান করেন।

রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের পর এক বছর এক মাস ২৩ দিন তিনি দক্ষতার সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের দায়িত্ব পালনকালীন সময়েই একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ের আমলা হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখেন তিনি। চলতি বছরের মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নব-নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। এর ঠিক আগেরদিন দুপুর সোয়া ১টায় নতুন পদে যোগ দিতে এসে সচিবালয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নাসিমুল গনি তাঁর গুরুদায়িত্ব প্রাপ্তির উচ্চারণে সুস্পষ্ট করেন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া আমানত ও দায়িত্ব হিসেবে দেখার মানসিকতাকে। তিনি বলেছিলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, দেশের একটা যুগসন্ধিক্ষণে আমার দুর্বল স্কন্ধে (কাঁধে) বিশাল দায়িত্ব পড়েছে। আমি সেটার ভার বহনের চেষ্টা করবো ইনশাল্লাহ, আমার সাধ্যমতো। অতীতে যেভাবে কাজ করেছি, সেভাবেই কাজ করবো।’

নাসিমুল গনি সেদিন যখন এই পদে দায়িত্ব নিয়েছিলেন তখন কেবলই এটি একটি পদ নয় বরং সময়ের কারণে এর দায়িত্বও স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ছিল অনেক বেশি। তিনি তাঁর সেই বক্তব্যের মাধ্যমে দায়িত্বের বিশালত্বের সঙ্গে নিজের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেন গভীর বিনয়ের সঙ্গেই। নতুন সরকারের প্রথম ৬ মাস প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা হিসেবে শক্ত হাতে প্রশাসন সামলেছেন। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভেঙে পড়া প্রশাসনকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করেন। তাঁর প্রশাসনিক সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা এবং মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়গুলোও মূল্যায়ন করেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে তাকে আরও এক বছর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ এই নিয়োগ সরকারপ্রধানের দূরদর্শী সিদ্ধান্তের প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা।

কালের আলো/এমএএমএমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন