গ্যাস সংকটে সম্ভাবনায় ১৫০ কূপ

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬ । ১০:২২ পূর্বাহ্ণ

দেশে গ্যাসের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। একই সময়ে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে ঘাটতি সামাল দিতে বাড়ছে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর নির্ভরতা।

এই পরিস্থিতিতে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ২৯টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে দৈনিক ২৭০ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে বলে সম্প্রতি সংসদে জানানো হয়েছে।

সরকারের প্রত্যাশা, কর্মসূচির বাকী অংশ বাস্তবায়িত হলে দেশে গ্যাসের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। পুরো কর্মসূচি সফলভাবে শেষ হলে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৪০১ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদনের আশা করছে সরকার।

তবে এই উদ্যোগ গ্যাসের ঘাটতি কতটা কমাতে পারবে, তা নির্ভর করবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর। নতুন কূপগুলো থেকে প্রত্যাশিত পরিমাণ গ্যাস বাস্তবে পাওয়া যাবে কি না, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কত দ্রুত কমবে এবং একই সময়ে দেশের গ্যাসের চাহিদা কতটা বাড়বে—মূলত এসবের ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ সরবরাহ পরিস্থিতি।

দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর বড় সুযোগ
সরকারের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ২০টি উৎপাদনশীল গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৬৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। পাশাপাশি ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপের খনন ও ওয়ার্কওভার শেষ করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

১৫০ কূপের কর্মসূচির ২৯টির কাজ শেষ হওয়ার পরই দৈনিক ২৭০ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ সম্ভাব্য সংস্থান এবং বাস্তবে গ্রিডে যুক্ত হওয়া গ্যাসের মধ্যে এখনো উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে।

তবে আরও কূপের কাজ চলমান রয়েছে। এগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ আরও বাড়বে। আর পুরো কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে দেশীয় উৎপাদনে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

আমদানিনির্ভরতার চাপ
দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানিও বাড়াতে হচ্ছে। ২০২৫ সালে ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানিতে প্রায় ৩ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। এর আগের বছর ৮৬টি কার্গোর জন্য ব্যয় হয়েছিল ৩ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ৮৫৫ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার। ফলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আমদানি ব্যয়—দুই দিক থেকেই দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ১৫০ কূপের কর্মসূচি সফল হলে দেশে গ্যাসের সরবরাহ বাড়বে। তবে শুধু এই কর্মসূচির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সংকটের সমাধান সম্ভব হবে না। নতুন কূপ থেকে কতটা গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে এবং পুরোনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কী হারে কমছে—তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চাহিদার প্রবৃদ্ধিকেও বিবেচনায় নিতে হবে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম মনে করেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো এখন জরুরি হলেও একে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর সব দেশই নিজেদের জ্বালানি উৎস কাজে লাগাতে চায়। বাংলাদেশেও নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ থাকলে সেটি কাজে লাগানো উচিত।’

শফিকুল আলম বলেন, গত এক দশকের বেশি সময়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে প্রয়োজন অনুযায়ী বিনিয়োগ হয়নি। নতুন আবিষ্কার ও উৎপাদন না বাড়ায় বাংলাদেশ আমদানির দিকে গেছে। মহামারী, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকট এবং টাকার দরপতন আমদানিনির্ভরতার আর্থিক ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করেছে।

অনুসন্ধান ও বিকল্প জ্বালানিতে সমন্বিত উদ্যোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৫০ কূপের কর্মসূচি দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এর পাশাপাশি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার, সমুদ্রভিত্তিক অনুসন্ধান, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি—বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানিতে রূপান্তরের উদ্যোগও সমান্তরালে এগিয়ে নিতে হবে।

পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ার বাস্তবতায় নতুন কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার একদিকে যেমন তাৎক্ষণিক সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে নতুন অনুসন্ধান ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা দেশের গ্যাস নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। এজন্য ১৫০ কূপের কর্মসূচি শুধু অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদনের উদ্যোগ নয়; সঠিকভাবে বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধানের সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে এটি দেশীয় জ্বালানি সক্ষমতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

কালের আলো/এম/এএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন