দেশের বিভিন্ন কারাগারে উগ্রবাদী বন্দিদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠা ঠেকাতে তাদের আলাদা সেলে রাখার পরিকল্পনা করছে কারা কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে কারাগারের নিরাপত্তা জোরদার এবং বন্দিদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে কারা সদরদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোতাহার হোসেন।
সম্প্রতি ঢাকা, আশুলিয়া, সাভারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা উদ্ধারের ঘটনায় ‘বোমারু মামুন’ ও উজ্জ্বলের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। জানা গেছে, কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকার সময় তাদের মধ্যে যোগাযোগ ও একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ তৈরি হয়। পরে জামিনে বেরিয়ে তারা বিভিন্ন স্থানে বোমা রাখার ঘটনায় জড়িত হন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
কারাগারের ভেতরে দুই উগ্রবাদী কীভাবে একসঙ্গে থাকা ও যোগাযোগের সুযোগ পেলেন—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আইজি প্রিজন বলেন, দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দির সংখ্যা অনেক বেশি। আবাসন সংকটের কারণে অনেক সময় বন্দিদের কাছাকাছি থাকার সুযোগ তৈরি হয়।
তিনি বলেন, উগ্রবাদীরা একে অপরের কাছে থাকার সুযোগ পেয়ে যায়। তবে তারা কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে যেতে পারে না। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। পাশাপাশি উগ্রবাদী বন্দিদের আলাদা সেলে রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে।
এখনও পলাতক ৬৯০ বন্দি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ২ হাজার ২৪৭ বন্দির মধ্যে এখনো ৬৯০ জন পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছেন আইজি প্রিজন।
তিনি জানান, পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে ১ হাজার ৫৫৭ জনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি ৬৯০ জনকে গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এ ছাড়া নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ৮২৬ বন্দির মধ্যে ১৬৬ জনের বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।
‘কারাগারে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না’
কারাগারে কোনো বন্দিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আইজি প্রিজন বলেন, কাউকেই বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি জানান, বর্তমানে দেশে ৭৫টি কারাগার রয়েছে। প্রতিটি কারাগারে বন্দিদের খাবারের পরিমাণ ও মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তবে ২১টি কারাগার সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।
মাদক ও দুর্নীতিতে ‘জিরো টলারেন্স’
কারাগারে মাদক প্রবেশ এবং এ কাজে কারারক্ষীদের সহযোগিতার অভিযোগ প্রসঙ্গে আইজি প্রিজন বলেন, মাদক ও আর্থিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কারা বিভাগ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে।
তার তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে এসব ঘটনায় ২১ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে এবং ৮২ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এ ছাড়া ৮৭০ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের বিভাগীয় মামলা হয়েছে। ছোটখাটো অপরাধের কারণে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ৩০৩ জনকে বিভিন্ন বিভাগ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, কোনো কারারক্ষী মাদকসংক্রান্ত অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বন্দিদের মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ নেই
কারাগারে থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মোবাইলে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আইজি প্রিজন বলেন, কারাগারে কোনো মোবাইল ব্যবহার হচ্ছে না—এমন নিশ্চয়তা শতভাগ দেওয়া সম্ভব নয়।
তবে কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারে, যেখানে রাজনৈতিক বন্দিরা রয়েছেন, সেখানে জ্যামার স্থাপন করা হয়েছে বলে জানান তিনি। ফলে কেউ মোবাইল নিয়ে কারাগারে প্রবেশ করলেও সেখান থেকে কথা বলার সুযোগ নেই বলে দাবি করেন আইজি প্রিজন।
এআই প্রযুক্তিতে নজরদারির পরিকল্পনা
দেশের ৭৫টি কারাগারে বর্তমানে কয়েক হাজার সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে বন্দিদের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও আধুনিক ক্যামেরা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে সব কারাগারকে উন্নত নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া বন্দিদের থানায় নেওয়া-আসার সময় ব্যবহৃত প্রিজন ভ্যানে আইপি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য পুলিশকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রিজন ভ্যান পুলিশের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় বলেও জানান তিনি।
কারাগারে বন্দিদের ভার্চুয়াল হাজিরার ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে বলে জানান আইজি প্রিজন।
দেশের কারাগারে ৩৭৯ বিদেশি বন্দি
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৩৭৯ জন বিদেশি বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৭০ জনের সাজা শেষ হয়েছে। সাজা শেষ হওয়া এসব বন্দির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
ইতোমধ্যে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী দুই বিদেশি বন্দিকে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলেও জানান কারা মহাপরিদর্শক।
কালের আলো/এম/এএইচ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬ । ৪:৫০ অপরাহ্ণ