জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) বড় ধরনের প্রশাসনিক রদবদল হয়েছে। কর অঞ্চলগুলোর কমিশনার এবং কর গোয়েন্দা ইউনিটের শীর্ষ পদসহ গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। বৃহস্পতিবার একযোগে ২২ কর কমিশনারের দায়িত্বে পরিবর্তন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে এনবিআর প্রশাসন।
এই রদবদলের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)–এর মহাপরিচালক পদে প্রথমবারের মতো একজন নারীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ঢাকার কর অঞ্চল-৪-এর কমিশনার সেলিনা সুলতানাকে সিআইসির মহাপরিচালক করা হয়েছে।
কর প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল এই ইউনিটের নেতৃত্বে একজন নারীর আসীন হওয়া এনবিআরের ইতিহাসে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে কর আদায়, কর ফাঁকি শনাক্তকরণ, গোপন তথ্য বিশ্লেষণ ও রাজস্ব-সংক্রান্ত অনিয়ম অনুসন্ধানে সিআইসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ফলে এই ইউনিটের শীর্ষ পদে সেলিনা সুলতানার নিয়োগকে শুধু একটি প্রশাসনিক পদায়ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি কর প্রশাসনে নারীদের নেতৃত্বের পরিসর আরও বিস্তৃত হওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
বিশেষ করে কর গোয়েন্দার মতো তথ্যনির্ভর ও সংবেদনশীল একটি ইউনিটে একজন নারী কর্মকর্তার নেতৃত্ব গ্রহণ দেখিয়ে দেয়, এনবিআরের উচ্চপর্যায়ের দায়িত্ব পালনে নারী কর্মকর্তাদের সক্ষমতা ও নেতৃত্বের ওপর আস্থার জায়গাটি আরও শক্তিশালী হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে কর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী ও অপারেশনাল পদে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার পথও প্রশস্ত হতে পারে।
সিআইসির বর্তমান মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রকিবকে ঢাকার কর অঞ্চল-৮-এর কমিশনারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর আগে তিনি এনবিআরের আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটের কর কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তাকে সিআইসির মহাপরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে, ঢাকার কর অঞ্চল-১৯-এর কমিশনার লুৎফুন্নাহার বেগমকেও একই পদে বহাল রাখা হয়েছে। রদবদলের ফলে কর অঞ্চলগুলোর নেতৃত্বে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নতুন দায়িত্ব বণ্টনের পাশাপাশি গোয়েন্দা কার্যক্রমেও নতুন নেতৃত্ব এসেছে। এদিন, পৃথক প্রজ্ঞাপনে ১২ জন অতিরিক্ত কর কমিশনারকে প্রথমে কর কমিশনার হিসেবে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে তাদেরসহ অন্যান্য কর্মকর্তাকে বিভিন্ন কর অঞ্চল ও ইউনিটে পদায়ন করা হয়। সব মিলিয়ে ২২ কর কমিশনারের দায়িত্বে পরিবর্তন এসেছে।
বদলির ধারাবাহিকতায় নতুন অধ্যায়
এনবিআরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক দফায় বড় ধরনের প্রশাসনিক রদবদল হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পরও কর প্রশাসনে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছিল। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে সিআইসি থেকে শুরু করে একযোগে দেশের ৪০ জন কর কমিশনারকে বদলি করা হয়, যা এনবিআরের ইতিহাসে বিরল ঘটনা হিসেবে আলোচিত হয়।
সেই রদবদলে তৎকালীন সিআইসি মহাপরিচালক খাইরুল ইসলামকে বদলি করে ওই পদে আনা হয় ঢাকার কর অঞ্চল-১৫-এর তৎকালীন কমিশনার আহসান হাবিবকে। পরবর্তী সময়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার তাকে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়। এরপর বর্তমান রদবদলে আবারও সিআইসির শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন এলো। তবে এবারের পরিবর্তনের বিশেষত্ব শুধু কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বদলে সীমাবদ্ধ নয়—সিআইসির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণই এই পদায়নকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ সেলিনা সুলতানার নিয়োগ?
সিআইসি এনবিআরের এমন একটি ইউনিট, যার কাজের সঙ্গে কর ফাঁকি, গোপন আর্থিক তথ্য, কর-অনিয়মের অনুসন্ধান এবং রাজস্ব ঝুঁকি শনাক্তকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত। এই ইউনিটের নেতৃত্বে একজন নারী কর্মকর্তার নিয়োগ তাই কর প্রশাসনে নেতৃত্বের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি একটি প্রতীকী পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দেয়।
তবে এর প্রকৃত তাৎপর্য নির্ভর করবে সেলিনা সুলতানা কীভাবে সিআইসির গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ান, তথ্য বিশ্লেষণকে আরও কার্যকর করেন এবং বড় ধরনের কর ফাঁকি ও রাজস্ব অনিয়ম শনাক্তকরণে ইউনিটটিকে কতটা শক্তিশালী করতে পারেন তার ওপর।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এনবিআরের এবারের বড় রদবদলের মধ্যে অনেক কর্মকর্তার পদায়ন প্রশাসনিক স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হলেও সিআইসির প্রথম নারী প্রধান হিসেবে সেলিনা সুলতানার দায়িত্ব গ্রহণ নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এটি শুধু একজন কর্মকর্তার পদোন্নতি বা পদায়ন নয়; বাংলাদেশের রাজস্ব প্রশাসনের নেতৃত্বে নারীর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিরও একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।
কালের আলো/এম/এএইচ

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬ । ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ