বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন পর একটি ইতিবাচক খবর—বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবার ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। সর্বশেষ ২৪ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেশের গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) BPM6 পদ্ধতিতে হিসাব করলে সেই রিজার্ভ ৩২ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার।
অঙ্কটি নিঃসন্দেহে স্বস্তির। কারণ রিজার্ভ কেবল একটি হিসাবের সংখ্যা নয়; এটি একটি দেশের বৈদেশিক লেনদেন সামলানোর সক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। খাদ্য আমদানি, জ্বালানি কেনা, শিল্পের কাঁচামাল আনা, বিদেশি ঋণ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক দায় পরিশোধ—সব ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয় বৈদেশিক মুদ্রা। তাই রিজার্ভ বাড়লে প্রথম স্বস্তিটা আসে ডলার নিয়ে। ডলারের সরবরাহ নিয়ে হঠাৎ বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমে। আমদানি বিল মেটানোর সক্ষমতা বাড়ে। ব্যাংকিং খাতেও বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনে কিছুটা স্বাভাবিকতা ফেরে।
কিন্তু এখানেই থেমে গেলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ প্রশ্ন এখন শুধু ‘রিজার্ভ কত?’ নয়। প্রশ্ন হলো—‘রিজার্ভ কেন বাড়ছে, কতটা ব্যবহারযোগ্য এবং এই বাড়তি বৈদেশিক মুদ্রা অর্থনীতির বাস্তব সংকট কতটা কমাতে পারবে?’
চার বছর পর ৩৭ বিলিয়নের ঘরে
বাংলাদেশের জন্য ৩৭ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভের অঙ্কটি প্রতীকীও বটে। কয়েক বছর আগে এই পর্যায়ের রিজার্ভ ছিল স্বাভাবিক বাস্তবতা। এরপর বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, আমদানি ব্যয়, ডলার সংকট এবং রিজার্ভ ক্ষয়ের ধারায় পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্টে গ্রস রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩১ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়নে পৌঁছায়। জুলাই শেষে কিছুটা কমে ৩৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন হলেও আগস্টে আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। অর্থাৎ এটি এক দিনের কোনো উল্লম্ফন নয়। কয়েক মাস ধরে রিজার্ভে একটি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এখানেই বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব।
কারণ একসময় বাংলাদেশকে রিজার্ভ বাঁচাতে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছিল। ডলার সংকটের কারণে ব্যাংকগুলোতে এলসি খোলা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ব্যবসায়ীদের আমদানি পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে হয়েছে। ডলারের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। সেই জায়গা থেকে ৩৭ বিলিয়ন ডলারে ফিরে আসা অবশ্যই বড় পরিবর্তন।
কিন্তু ৩৭ বিলিয়ন মানেই হাতে ৩৭ বিলিয়ন নয়
রিজার্ভ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুল বোঝাবুঝির জায়গাটি এখানেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রস রিজার্ভের অঙ্ক এবং আইএমএফের BPM6 পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভ এক নয়। ২৪ আগস্ট এই দুই অঙ্কের মধ্যে ব্যবধান ছিল প্রায় ৪ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার। এর অর্থ এই নয় যে গ্রস রিজার্ভের ওই অংশ ‘নেই’। বরং আন্তর্জাতিক হিসাবপদ্ধতিতে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক দায়সহ কিছু বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যে পরিমাণকে তুলনামূলকভাবে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ হিসেবে দেখা হয়, BPM6 সেই বাস্তবতাকে বেশি প্রতিফলিত করে।
তাই বাংলাদেশের অর্থনীতির সক্ষমতা বিচার করতে শুধু বড় অঙ্কের গ্রস রিজার্ভ দেখলে হবে না। বরং দেখতে হবে—বাস্তবে কতটা বৈদেশিক মুদ্রা হাতে রেখে আমদানি, ঋণ পরিশোধ এবং সম্ভাব্য বৈদেশিক চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব। এখানেই ৩৭ বিলিয়নের উচ্ছ্বাসকে কিছুটা বাস্তবতার মাটিতে নামিয়ে আনা দরকার।
রিজার্ভ বাড়ছে কেন?
রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে দৃশ্যমান কারণগুলোর একটি হলো রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ৪৮ দিনে বাংলাদেশে ৪ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। আগস্টের প্রথম ১৭ দিনেই এসেছে ১ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার—আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ রেমিট্যান্স সরাসরি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ায়। প্রবাসীরা বৈধ পথে বেশি অর্থ পাঠালে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের প্রবাহ বাড়ে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর ডলার সরবরাহের চাপ কমে এবং রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনে শৃঙ্খলা ফেরার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে রিজার্ভ বৃদ্ধিকে কেবল ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকা জমা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর পেছনে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রবাহ এবং বাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতাও রয়েছে।
তাহলে কি ডলার সংকট শেষ?
এখানেও উত্তর—পুরোপুরি নয়। রিজার্ভের উন্নতি ডলার সংকটের ঝুঁকি কমায়, কিন্তু অর্থনীতির বৈদেশিক মুদ্রার সব চাপ একসঙ্গে শেষ করে দেয় না। কারণ, বাংলাদেশের ডলারের প্রয়োজন অব্যাহত। খাদ্য, জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, মূলধনি যন্ত্রপাতি—সবকিছুর জন্য আমদানি দরকার। আবার বিদেশি ঋণের কিস্তি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক দায়ও
পরিশোধ করতে হয়। অর্থাৎ রিজার্ভ বাড়ার পাশাপাশি যদি আমদানির চাহিদা দ্রুত বাড়ে, তাহলে রিজার্ভের ওপর চাপও বাড়তে পারে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। রিজার্ভ বাড়ছে—এটি ভালো খবর। কিন্তু সেই রিজার্ভ কত দ্রুত ব্যয় হচ্ছে, কেন ব্যয় হচ্ছে এবং ব্যয়ের বিপরীতে অর্থনীতিতে কতটা উৎপাদনশীল সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে—সেটিই দীর্ঘমেয়াদে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে রিজার্ভের ভূমিকা কোথায়?
এখন আসা যাক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে—রিজার্ভ বাড়লে কি গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দ্রুত কমবে? আংশিকভাবে হ্যাঁ, কিন্তু সরাসরি নয়।।বাংলাদেশ যদি পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা হাতে রাখতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি আমদানির বিল পরিশোধের সক্ষমতা বাড়ে। প্রয়োজনীয় এলসি খোলা সহজ হয়। জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে ব্যাংক ও আমদানিকারকদের ওপর ডলার সংকটের চাপ কমে। অর্থাৎ রিজার্ভ জ্বালানি সংকট সমাধানের আর্থিক সক্ষমতা তৈরি করতে পারে। কিন্তু রিজার্ভ নিজে গ্যাস উৎপাদন বাড়ায় না, বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা বাড়ায় না কিংবা জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা দূর করে না।
এখানেই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের হাতে ডলার আছে—এটি একটি সক্ষমতা। কিন্তু সেই ডলার দিয়ে সময়মতো জ্বালানি আমদানি করা, বন্দর থেকে দ্রুত খালাস করা, বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো—এসব হলো নীতি ও ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন। তাই ৩৭ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভকে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের ‘সমাধান’ বলা যাবে না। বরং এটি সংকট মোকাবিলার জন্য একটি বড় আর্থিক বাফার তৈরি করে।
স্বস্তি আছে, তবে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই
রিজার্ভের বর্তমান অবস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। বিশেষ করে এমন একটি অর্থনীতির জন্য, যেখানে কিছুদিন আগেও ডলার সংকট ছিল, আমদানি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়েছিল এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ ছিল—সেখানে রিজার্ভের পুনরুদ্ধার আস্থার জায়গা তৈরি করে।।কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, রিজার্ভ কোনো দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। রেমিট্যান্স বাড়ছে—এটি ভালো। রিজার্ভ বাড়ছে—এটিও ভালো। ডলারের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল হচ্ছে—এটিও স্বস্তির। কিন্তু এর সঙ্গে রপ্তানি, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্যও শক্তিশালী হতে হবে। কারণ শুধু রিজার্ভ জমিয়ে একটি অর্থনীতি দীর্ঘদিন শক্তিশালী থাকে না। রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ার পেছনে যে আয় ও উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক ভিত্তি থাকে, সেটিই শেষ পর্যন্ত টেকসই শক্তি তৈরি করে।
৩৭ বিলিয়ন এখন পরীক্ষা
তাই বাংলাদেশের জন্য ৩৭ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভকে সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা যায় একটি স্বস্তির মাইলফলক হিসেবে—চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে নয়। এই রিজার্ভ এখন সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কিছুটা বেশি নীতিগত জায়গা দিচ্ছে। জ্বালানি আমদানি, শিল্পের কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য ও প্রয়োজনীয় আমদানিতে ডলার সরবরাহ নিশ্চিত করার সুযোগ বাড়ছে। কিন্তু আসল পরীক্ষা হবে সামনে। রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ ধরে রাখা যায় কি না, রপ্তানি আয় বাড়ে কি না, আমদানি ব্যবস্থাপনা কতটা শৃঙ্খলিত থাকে এবং সবচেয়ে বড় কথা—এই বাড়তি বৈদেশিক মুদ্রার সক্ষমতা অর্থনীতির উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে কতটা কাজে লাগানো যায়। কারণ রিজার্ভের অঙ্ক বড় হওয়া স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু সেই স্বস্তিকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করাই এখন বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ। ৩৭ বিলিয়ন ডলার তাই শেষ গন্তব্য নয়। এটি বরং একটি প্রশ্নের নতুন শুরু—বাংলাদেশ কি এবার রিজার্ভ শুধু বাড়াবে, নাকি সেই রিজার্ভের শক্তিতে অর্থনীতিকেও আরও শক্তিশালী করবে?
কালের আলো/এম/এএইচ

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬ । ৪:৪১ অপরাহ্ণ