৯ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের কাছে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের সেই ভয়াবহতা আজও অতীত নয়—বরং প্রতিদিনের বাস্তবতার অংশ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখো রোহিঙ্গা এখনও তাকিয়ে আছে নিজ মাতৃভূমির দিকে। গণহত্যা স্মরণ দিবসে তাদের কণ্ঠে তাই একটাই আকুতি—‘আমরা শরণার্থী হয়ে থাকতে চাই না, নিরাপদে নিজ দেশে ফিরতে চাই।’
‘নাইন ইয়ারস গন, থিংক টেন মিনিটস ফর রোহিঙ্গা’—নয় বছর চলে গেছে, রোহিঙ্গাদের নিয়ে অন্তত ১০ মিনিট ভাবো—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) কক্সবাজারের উখিয়ার ক্যাম্প-৪ এক্সটেনশনের ফুটবল মাঠে অনুষ্ঠিত হয় বড় ধরনের সমাবেশ। রোহিঙ্গাদের নাগরিক সংগঠন ‘ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা’ (ইউসিআর) আয়োজিত কর্মসূচিতে উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে শিশু, নারী, তরুণ ও প্রবীণসহ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা অংশ নেন।
- গণহত্যা স্মরণ দিবসে উখিয়া-টেকনাফে লাখো রোহিঙ্গার সমাবেশ
- নিরাপদ প্রত্যাবাসন, নাগরিকত্ব ও হারানো ভিটেমাটি ফেরতের দাবি
বৃষ্টি উপেক্ষা করে সকাল থেকেই ক্যাম্পগুলোতে ছিল সরব উপস্থিতি। ‘হোপ ইজ হোম’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গারা গণহত্যার বিচার, নাগরিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের দাবি জানান। তাদের স্লোগানে বারবার উঠে আসে—গণহত্যা বন্ধ করতে হবে, অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে, নিজ দেশে ফেরার পথ খুলে দিতে হবে।
শরণার্থী জীবনের নয় বছর
২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা। মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ তাদের সীমান্ত খুলে দিলেও দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট এখন শুধু একটি মানবিক ইস্যু নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও পরিবেশগত চাপেরও বড় উৎস। উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে বর্তমানে ১১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৫২ রোহিঙ্গা বসবাস করছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। ভাসানচরের আশ্রয়ণ প্রকল্পে রয়েছে আরও ৩৩ হাজার ৮১৯ জন।

নতুন করে আসা ব্যক্তিদের ধরলে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৪ লাখ ছাড়িয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর তথ্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। অর্থাৎ, নয় বছর আগে যে সংকটকে সাময়িক শরণার্থী পরিস্থিতি হিসেবে দেখা হয়েছিল, তা এখন একটি দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। একটি প্রজন্ম ইতোমধ্যে ক্যাম্পেই বেড়ে উঠছে। অনেক শিশু মিয়ানমারের মাটি চোখেই দেখেনি।
‘ক্যাম্পে জন্ম, ক্যাম্পেই ভবিষ্যৎ?’
রোহিঙ্গাদের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা যায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঘিরে। ক্যাম্প-৮-এর বাসিন্দা হাজেরা বেগমের কথায় সেই উৎকণ্ঠাই ফুটে ওঠে। তাঁর ভাষ্য, ক্যাম্পের আবদ্ধ পরিবেশে বেড়ে ওঠা সন্তানরা নিজ দেশের মাটিই দেখেনি। তাদের স্বাভাবিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে তিনি নিরাপদে স্বদেশে ফিরতে চান। ক্যাম্প-৬-এর বাসিন্দা ইব্রাহিম ও তরুণ মফিজের মতো অনেকেই মনে করেন, শুধু ত্রাণনির্ভর জীবন দিয়ে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব নয়। তাদের দাবি, মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়িয়ে রাখাইনে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তারা নিরাপদে ফিরে যেতে পারে। এই বাস্তবতা দেখিয়ে দেয়, রোহিঙ্গা সংকট কেবল খাদ্য, আশ্রয় কিংবা ত্রাণের প্রশ্ন নয়। এটি এখন একটি প্রজন্মের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, পরিচয় ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
প্রত্যাবাসনই সমাধান, তবে কেমন প্রত্যাবাসন?
সমাবেশে রোহিঙ্গাদের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—তারা মিয়ানমারে ফিরতে চান, কিন্তু যে কোনো মূল্যে নয়।।তাদের দাবি, প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে নাগরিকত্বের অধিকার, মৌলিক মানবাধিকার এবং নিরাপত্তা। ২০১৭ সালের সহিংসতায় হারানো সম্পদ ও বসতভিটা পুনরুদ্ধারের নিশ্চয়তাও তারা চান। এই দাবির গুরুত্ব এখানেই যে, অতীতের অভিজ্ঞতা রোহিঙ্গাদের আস্থাহীন করেছে। ২০১২, ২০১৭ এবং ২০২৪ সালে রাখাইনে ধারাবাহিক নিপীড়ন ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা তাদের নিরাপত্তাহীনতার স্মৃতি আরও গভীর করেছে। ফলে শুধু সীমান্ত পার করে ফেরত পাঠানোকে তারা প্রত্যাবাসনের সমাধান হিসেবে দেখছেন না; তারা চান এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে ফিরে যাওয়ার পর আবারও নিপীড়নের শিকার হতে না হয়।
সংকটের কেন্দ্রে মিয়ানমার, সমাধানে আন্তর্জাতিক চাপ
রোহিঙ্গাদের বক্তব্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি হতাশাও স্পষ্ট। নয় বছর ধরে আশ্রয় দেওয়ার জন্য তারা বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেও একই সঙ্গে বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী জীবন তাদের জন্য ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছে। এখন প্রশ্ন—আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি শুধু মানবিক সহায়তার মধ্যে নিজেদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ রাখবে, নাকি সংকটের মূল কারণ সমাধানে আরও কার্যকর ভূমিকা নেবে? রোহিঙ্গাদের দাবি, মিয়ানমারের ওপর দৃশ্যমান ও কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে হবে। রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ, নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি না হলে প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না। একই সঙ্গে ২০১৭ সালের হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবিও তারা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
নয় বছর পরও আশা হারায়নি
রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবসের কর্মসূচি তাই শুধু অতীতের শোক স্মরণের আয়োজন ছিল না। এর ভেতরে ছিল ভবিষ্যৎ ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও। সমাবেশ শেষে ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে নিহত রোহিঙ্গাদের স্মরণে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। শোক, ক্ষোভ ও প্রত্যাবাসনের আকাঙ্ক্ষা মিলেমিশে সেখানে যেন একটি বার্তাই স্পষ্ট করেছে—রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে, কিন্তু তাদের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা আশ্রয় নয়; মর্যাদার সঙ্গে নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়া।

নয় বছর পরও তাই ‘হোপ ইজ হোম’—আশাই ঘর। সেই আশা বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু রোহিঙ্গাদের অপেক্ষা নয়, প্রয়োজন মিয়ানমারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর, দীর্ঘমেয়াদি ও দৃশ্যমান উদ্যোগ। অন্যথায় আরও একটি প্রজন্ম ক্যাম্পের ভেতরেই বড় হবে, আর ২৫ আগস্টের স্মৃতি শুধু একটি গণহত্যা দিবস নয়—একটি অসমাপ্ত প্রত্যাবাসন সংকটের প্রতীক হয়ে থাকবে।
কালের আলো/এম/এএইচ

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬ । ৮:৪৪ অপরাহ্ণ