বন্ধকি স্বর্ণ ফেরত দিতে না পেরে ‘আত্মগোপন’, খুঁজে বের করলো পুলিশ

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬ । ৫:২৯ অপরাহ্ণ

চাঁদপুর শহরের পরিচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দাস, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান—চারজনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তৈরি হয়েছিল নানা প্রশ্ন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকা এবং হঠাৎ ব্যবসা ও বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়তে থাকে স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত সেই রহস্যের অবসান ঘটেছে চট্টগ্রামের পটিয়ায়।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ভোরে সেখানকার নিজ এলাকা থেকে চারজনকেই উদ্ধার করেছে চাঁদপুর সদর মডেল থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল। তবে পুলিশি উদ্ধারের পর সামনে এসেছে নিখোঁজ হওয়ার ভিন্ন একটি কারণ। পুলিশের অনুসন্ধান ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মানুষের কাছ থেকে স্বর্ণ বন্ধক রেখে তা সময়মতো ফেরত দিতে না পারায় পিন্টু দাস পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নিখোঁজের ঘটনায় বাড়ে উদ্বেগ
গত ২৬ আগস্ট পিন্টু দাসসহ পরিবারের চার সদস্য নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। একই সময়ে রংপুরে একই পরিবারের চারজন নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে উদ্বেগ ছিল। ফলে চাঁদপুরের একটি পরিবারের চার সদস্যের একসঙ্গে নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে গুরুত্ব পায়।পুলিশ প্রথমে নিখোঁজের বিষয়টি সাধারণভাবে তদন্ত শুরু করলেও পিন্টুর বাসা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশের মানুষের সঙ্গে কথা বলে নতুন তথ্য পায়।

জানা যায়, পিন্টু দাস স্বর্ণ বন্ধক রাখার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং বেশ কিছু মানুষের কাছ থেকে স্বর্ণ নিয়েছিলেন। এসব স্বর্ণ ফেরত দিতে না পারার চাপ থেকেই তিনি পরিবার নিয়ে আত্মগোপনে যেতে পারেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তের গতিপথ বদলে যায়।

প্রযুক্তির সহায়তায় শনাক্ত অবস্থান
পিন্টু দাস ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের উদ্ধারে চাঁদপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং সদর মডেল থানা পুলিশ যৌথভাবে কাজ শুরু করে। প্রায় দুই দিন তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অনুসন্ধান চালানোর পর পুলিশ তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। পরে সদর মডেল থানার একটি বিশেষ দল চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় অভিযান চালিয়ে শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে চারজনকে উদ্ধার করে।অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কালাম গাজী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফয়েজ আহমেদ জানান, পিন্টু দাস ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের পাওয়া যাচ্ছে না—এমন সংবাদ প্রকাশের পর পুলিশ তাঁদের উদ্ধারে কার্যক্রম শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করে বিশেষ দলের মাধ্যমে পটিয়া থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের চাঁদপুর সদর মডেল থানায় নিয়ে আসা হচ্ছে।

সামনে এখন মূল প্রশ্ন—বন্ধকি স্বর্ণ গেল কোথায়?
পিন্টু দাস ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের উদ্ধার করা গেলেও ঘটনার মূল জটিলতা এখনো কাটেনি। বরং উদ্ধারের পর তদন্তের সামনে এসেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন। মানুষের কাছ থেকে ঠিক কত পরিমাণ স্বর্ণ বন্ধক রাখা হয়েছিল? সেই স্বর্ণের বিপরীতে কী ধরনের লেনদেন হয়েছিল? কতজন গ্রাহক এখন তাঁদের স্বর্ণ ফেরত পাচ্ছেন না? স্বর্ণগুলো বর্তমানে কোথায়—এবং সেগুলো বিক্রি, হস্তান্তর কিংবা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার করা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইতোমধ্যে পিন্টু দাসের বিরুদ্ধে বন্ধক রাখা স্বর্ণ ফেরত না পাওয়ার অভিযোগে একাধিক ব্যক্তি চাঁদপুর সদর মডেল থানায় অভিযোগ করেছেন। ফলে ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের নিখোঁজ হওয়ার বিষয় হিসেবে থাকছে না; এর সঙ্গে আর্থিক লেনদেন ও সম্ভাব্য প্রতারণার অভিযোগও যুক্ত হয়েছে।

বাসা ছাড়ার বিষয়েও জিডি
পিন্টু দাস চাঁদপুর শহরের মিজানুর রহমান চৌধুরী সড়কের সৌর ভিলায় ভাড়া থাকতেন। তাঁর হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টিও পুলিশের নজরে আসে। ওই বাসার মালিকের ছেলে রাসেল খান গত ২২ আগস্ট সদর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এই জিডি, স্বর্ণ বন্ধক সংক্রান্ত অভিযোগ এবং পরিবারের হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো মিলিয়ে দেখলে ঘটনাটির পেছনে আর্থিক চাপের একটি সম্ভাব্য চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। তবে সেটি এখনো তদন্তসাপেক্ষ; পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।

আত্মগোপন, নাকি অন্য কোনো কারণ?
পরিবারের চার সদস্যকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হওয়ায় নিখোঁজের ঘটনায় সবচেয়ে বড় উদ্বেগ আপাতত কেটে গেছে। কিন্তু তাঁরা কেন চাঁদপুর ছেড়ে পটিয়ায় গেলেন, সেখানে কতদিন ছিলেন এবং তাঁদের সঙ্গে থাকা বা না থাকা বন্ধকি স্বর্ণের বিষয়ে কী তথ্য রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁদের নিখোঁজ হওয়ার কারণ এবং স্বর্ণ বন্ধক সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর বিস্তারিত জানা যাবে।

অর্থাৎ, এই ঘটনায় আপাতত একটি পরিবারের নিখোঁজ হওয়ার রহস্যের সমাধান হলেও শেষ হয়নি মূল তদন্ত। বরং পিন্টু দাসের ব্যবসায়িক লেনদেন, বন্ধকি স্বর্ণের হিসাব এবং অভিযোগকারীদের দাবি যাচাইয়ের মধ্য দিয়েই বেরিয়ে আসতে পারে ঘটনার প্রকৃত চিত্র।

কালের আলো/এম/এএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন