‘আমাগো নতুন ঘর দিছেন’—চাবি হাতে হাসল নান্দাইলের ৩৬ পরিবার

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬ । ১:১৩ পূর্বাহ্ণ

জরাজীর্ণ কুঁড়েঘর, ভাঙা দেয়াল আর অনিশ্চয়তার দিন পেরিয়ে এবার নিরাপদ আশ্রয়ের স্বপ্ন দেখছেন ময়মনসিংহের নান্দাইলের ৩৬টি অসহায় ও গৃহহীন পরিবার। তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে আধুনিক আধাপাকা ‘স্বপ্ন বাড়ি’র চাবি। একটি ঘর তাই যেন শুধু ইট, বালু আর সিমেন্টের কাঠামো নয়; বরং দীর্ঘদিনের বঞ্চনার পর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও নতুন করে বাঁচার প্রত্যয়ের প্রতীক।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী এবং ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল) আসনের সংসদ সদস্য ইয়াসের খান চৌধুরী নান্দাইল উপজেলায় দিনব্যাপী সফরে এসে এসব পরিবারের হাতে ঘরের চাবি তুলে দেন। একই দিনে নান্দাইল পৌরসভায় একটি উন্নয়নকৃত সড়কেরও উদ্বোধন করা হয়।

‘ঘর’ যখন শুধু ঘর নয়
দারিদ্র্যের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতাগুলোর একটি হলো নিরাপদ বাসস্থানের অভাব। দিনের শেষে মাথা গোঁজার মতো একটি নিরাপদ জায়গা না থাকলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান—কোনোটিই টেকসইভাবে এগিয়ে নেওয়া কঠিন। নান্দাইলের ৩৬ পরিবারের কাছে নতুন এই বাড়িগুলো তাই কেবল একটি সরকারি বা ব্যক্তিগত সহায়তা নয়; এগুলো তাদের জীবনের অনিশ্চয়তা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

  • বছরের পর বছর কুঁড়েঘরের কষ্ট শেষে নিরাপদ আশ্রয়
  • ‘স্বপ্ন বাড়ি’ ঘিরে উপকারভোগীদের চোখে স্বস্তি ও ভবিষ্যতের নতুন স্বপ্ন

উপকারভোগী হামিদা খাতুনের কথায় সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। সন্তানদের নিয়ে ভাঙা ঘরে বসবাসের কষ্টের পর নতুন ঘর পাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাঁর মতো পরিবারের জন্য একটি নিরাপদ ঘর মানে বর্ষায় পানি পড়ার আতঙ্ক থেকে মুক্তি, ঝড়ে ঘর ভেঙে পড়ার ভয় থেকে স্বস্তি এবং সন্তানদের নিয়ে তুলনামূলক নিশ্চিন্তে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করার সুযোগ।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তব উদ্যোগ
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, নান্দাইলের কোনো মানুষ যেন অনাহারে কিংবা আশ্রয়হীন অবস্থায় না থাকে—এটি ছিল তার মূল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। ৩৬টি পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে সেই প্রতিশ্রুতির সূচনা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে নান্দাইলের সর্বস্তরের গৃহহীন মানুষকে এই সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি নিজে উপস্থিত থেকে এসব ঘরের নির্মাণকাজ তদারকি করেছেন বলে জানান। ‘স্বপ্ন বাড়ি’ একটি এককালীন সহায়তার বদলে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষার কার্যকর মডেল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নিরাপদ ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিল যে চাবি
মোয়াজ্জেমপুর ইউনিয়নের বাহাদুর গ্রামের সবুজ মিয়ার অনুভূতিতেও উঠে এসেছে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার গল্প। নতুন পাকা ঘর তার পরিবারের সন্তানদের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যতের পথ খুলে দিয়েছে বলে জানান তিনি। এই অনুভূতি আসলে একটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একটি পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে বাসস্থানের ভূমিকা অনেক সময় আয়ের চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। নিরাপদ ঘর শিশুদের পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করে, পরিবারের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমায় এবং সামাজিক মর্যাদাও বাড়ায়। অর্থাৎ, একটি ঘরের চাবি হাতে তুলে দেওয়া মানে শুধু একটি স্থাপনার মালিকানা দেওয়া নয়—একটি পরিবারকে স্থিতিশীল জীবনের ভিত্তি দেওয়া।

সড়ক উন্নয়নেও জনজীবনের স্বস্তি
গৃহহীন পরিবারগুলোর হাতে ঘরের চাবি তুলে দেওয়ার পাশাপাশি নান্দাইল পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে ভূঁইয়াপাড়া সড়ক থেকে ভূঁইয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভায়া মামুনের বাড়ি পর্যন্ত ৩২৫ মিটার সড়ক ইউনিব্লক দিয়ে উন্নয়নের কাজের উদ্বোধন করা হয়। স্থানীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে এমন অবকাঠামোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। একটি ভালো সড়ক শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, রোগী ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচল সহজ করে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও পৌর এলাকার সংযোগ সড়ক উন্নত হলে স্থানীয় অর্থনীতি ও নাগরিক সেবায় এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একদিকে নিরাপদ বাসস্থান, অন্যদিকে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন—দুটি উদ্যোগই মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

অনন্য মানবিকতার বার্তা
অনুষ্ঠানে নান্দাইল উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক মিজানুর রহমান লিটনও ‘স্বপ্নবাড়ি’ উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং গৃহহীন মানুষের জন্য এ ধরনের জনকল্যাণমূলক কাজ অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা জানান। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ভিশন বাস্তবায়নে তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী নিজ এবং সরকারি উদ্যোগে গৃহহীনদের জন্য যে স্বপ্নবাড়ির উদ্যোগ নিয়েছেন তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। গৃহহীনদের জন্য এমন জনকল্যাণমূলক কাজ অব্যাহত থাকবে বলে আমি মনে করি।’

স্বপ্ন বাড়ি’র চাবি একটি সূচনা
নান্দাইলের ৩৬ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া ‘স্বপ্ন বাড়ি’র চাবি তাই একটি সূচনা। এই সূচনা যদি ধারাবাহিকতা পায়, আরও গৃহহীন পরিবার যদি নিরাপদ ঠিকানা পায়, তাহলে আজকের এই ৩৬টি ঘর একদিন নান্দাইলের বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের গল্পের প্রথম অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে। ভাঙা ঘরের কষ্ট থেকে পাকা ঘরের নিরাপত্তা—৩৬টি পরিবারের জন্য এই পরিবর্তন অভাবনীয়। প্রতিটি পরিবারের কাছে এটি একটি নতুন জীবনের শুরু।

কালের আলো/এম/এএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন