বাবার জনপ্রিয়তা ধরে রাখাই হাকনের বড় চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬ । ১২:৫৩ অপরাহ্ণ

রাজা হ্যারাল্ড পঞ্চমের মৃত্যুর পর নরওয়ের সিংহাসনে বসেছেন তার ছেলে হাকন অষ্টম। নতুন রাজা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরই তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে-দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় বাবা হ্যারাল্ডের মতো মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা ধরে রাখা।

সাধারণ নরওয়েজীয়দের মধ্যে হ্যারাল্ড ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিভিন্ন জরিপেও দীর্ঘদিন ধরে তার জনপ্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মৃত্যুর পর তাকে ঘিরে সাধারণ মানুষের আবেগও ছিল গভীর।

১৯০৫ সালে সুইডেনের কাছ থেকে স্বাধীন হওয়ার পর নরওয়েতে আধুনিক রাজতন্ত্র চালু হয়। সেই ধারাবাহিকতায় হাকন দেশটির রাজপরিবারের চতুর্থ রাজা। সিংহাসনে বসার পর প্রথম দিকের দায়িত্বের অংশ হিসেবে তিনি বিশেষ মন্ত্রিসভা বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। সেখানে নিজের রাজকীয় উপাধি ঘোষণা করার পাশাপাশি বাবার মূলমন্ত্র ‘নরওয়ের জন্য সবকিছু’ গ্রহণ করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, পূর্বসূরিদের পথ অনুসরণ করার জন্য হাকন ভালো অবস্থানে রয়েছেন। যুবরাজ থাকাকালে তিনি বাবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন এবং বিভিন্ন রাজকীয় দায়িত্ব পালনে তাকে সহযোগিতা করেছেন।

হ্যারাল্ড অসুস্থ থাকলে কিংবা দেশের বাইরে থাকলে অনেক সময় তার প্রতিনিধিত্ব করেছেন হাকন। নিজের জীবনী দ্য কিং টেলস-এ ছেলের বিষয়ে হ্যারাল্ড লিখেছিলেন, যুবরাজ হাকনই তার দায়িত্ব এগিয়ে নিয়ে যাবেন—এতে তিনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন।

ইতিহাসবিদ ট্রন্ড নোরেন ইসাকসেনের মতে, হাকন তার বাবার চেয়ে ভিন্ন ধরনের রাজা হবেন। হ্যারাল্ড ছিলেন অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও রসবোধসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। অন্যদিকে হাকন কিছুটা শান্ত ও চুপচাপ স্বভাবের। তবে গত কয়েক বছরে মানুষের সঙ্গে আরও খোলামেলা হয়েছেন এবং নিজের রসবোধও প্রকাশ করতে শুরু করেছেন।

১৯৭৩ সালে জন্ম নেওয়া হাকন ছিলেন হ্যারাল্ড ও রানি সোনিয়ার সবচেয়ে ছোট সন্তান। তার ২২ বছর বয়সী মেয়ে ইনগ্রিড আলেকজান্দ্রা এখন নরওয়ের সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী।

হাকনের শৈশবও পুরোপুরি রাজকীয় পরিবেশে কাটেনি। ২০২৩ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনীতে তিনি জানান, সরকারি স্কুলে পড়ার সময় রাজপরিবারের সদস্য হওয়ার বিষয়টি নিয়ে সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলতে তিনি স্বস্তি বোধ করতেন না।

১৯৯১ সালে তার দাদা রাজা ওলাভ পঞ্চম মারা গেলে মাত্র ১৭ বছর বয়সে যুবরাজ হন হাকন। পরে চার বছর নৌবাহিনীতে কাজ করেন এবং ১৯৯৫ সালে নরওয়ের নৌ একাডেমি থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলি ক্যাম্পাসে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন।

১৯৯৯ সালে নরওয়েতে ফেরার পর একটি সংগীত উৎসবে মেতে-মারিতের সঙ্গে হাকনের পরিচয় হয়। সাধারণ পারিবারিক ও সামাজিক পটভূমি থেকে উঠে আসা মেতে-মারিতকে তখন সংবাদমাধ্যম ‘ক্রিস্টিয়ানস্যান্ডের সিন্ডারেলা’ নামে অভিহিত করেছিল।

২০০১ সালে তাদের বিয়ের আগে এই সম্পর্ক নিয়ে নরওয়েতে তীব্র আলোচনা হয়। মেতে-মারিতের আগের সম্পর্ক, তার সন্তানের বাবা এবং অতীত জীবনযাপন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এমনকি কয়েকজন বিশ্লেষক আশঙ্কা করেছিলেন, এই সম্পর্ক নরওয়ের রাজতন্ত্রের জন্য সংকট তৈরি করতে পারে।

তবে বিয়ের আগে নিজের অতীত নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান মেতে-মারিত। সময়ের সঙ্গে তিনি সাধারণ মানুষের ভালোবাসাও অর্জন করেন। পরে তাকে নরওয়ের আধুনিক ও পরিবর্তনশীল রাজতন্ত্রের অন্যতম প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।

হাকনও স্ত্রীকে নিজের স্বভাবের ভারসাম্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, তিনি তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণধর্মী ও সামাজিকভাবে কিছুটা গুটিয়ে থাকা মানুষ। অন্যদিকে মেতে-মারিত সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশতে পারেন।

তবে অস্থির এক সময়ে সিংহাসনে বসেছেন হাকন। সাম্প্রতিক সময়ে নরওয়ের রাজপরিবার একাধিক বিতর্কের মুখে পড়েছে।

হাকনের স্ত্রী মেতে-মারিত দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার বিষয়টি নিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি স্বীকার করেছেন, এ ক্ষেত্রে তার বিচারবোধ ভালো ছিল না।

অন্যদিকে মেতে-মারিতের আগের সম্পর্কের ছেলে মারিয়ুস বর্গ হইবি ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে চার বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন। তিনি অবশ্য রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। যদিও হইবি আনুষ্ঠানিকভাবে রাজপরিবারের সদস্য নন, ছোটবেলা থেকেই রাজপরিবারের সঙ্গে বেড়ে ওঠায় তার কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।

এর পাশাপাশি মেতে-মারিত দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের জটিল রোগে ভুগছেন। চলতি বছর তার ফুসফুস প্রতিস্থাপনও করা হয়েছে। ফলে নতুন রাজা হিসেবে দেশের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অসুস্থ স্ত্রীকে সমর্থন দেওয়ার দায়িত্বও হাকনকে সামলাতে হচ্ছে।

নানা বিতর্ক সত্ত্বেও নরওয়ের রাজপরিবারের প্রতি মানুষের সমর্থন এখনো রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে রাজতন্ত্রের জনপ্রিয়তা কমার ইঙ্গিত মিলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হাকন দায়িত্ব পালনের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই প্রস্তুতি নিয়েছেন। বাবার কাছ থেকে তিনি রাজকীয় দায়িত্বের অভিজ্ঞতা পেয়েছেন এবং বহু বছর ধরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কাজে অংশ নিয়েছেন।

এখন তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে হ্যারাল্ডের রেখে যাওয়া আস্থা ও জনপ্রিয়তা ধরে রাখা। রাজপরিবারকে ঘিরে চলমান বিতর্ক, স্ত্রীর অসুস্থতা এবং পরিবারের সদস্যদের নানা কর্মকাণ্ডের মধ্যেই তাকে নরওয়ের রাজতন্ত্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাস আরও শক্তিশালী করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের আশা, দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী হিসেবে পরিচিত হাকন শেষ পর্যন্ত তার পূর্বসূরিদের মতোই নরওয়েজীয়দের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করতে পারবেন।

কালের আলো/এসএ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন