পাঁচ বছরে এক কোটির বেশি কর্মসংস্থান, বড় স্বপ্ন সরকারের

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬ । ৭:৩৪ অপরাহ্ণ

আগামী পাঁচ বছরে এক কোটির বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য সামনে রেখে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন ফাউন্ডেশনগুলোকে নতুন কাঠামোয় কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে এসব ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম সমন্বয় করে ক্লাস্টারভিত্তিকভাবে কাজ করানো হবে। কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, নারী উন্নয়ন, কৃষি, স্বাস্থ্য ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতকে এই পরিকল্পনার আওতায় আনা হচ্ছে।

শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এনইসি অডিটরিয়ামে ২২টি ফাউন্ডেশনের ১৮০ দিনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের ভিত্তিতে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে সমৃদ্ধির পথে এগোতে সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল অনুমোদন করেছে। এই কৌশল বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি ফাউন্ডেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

ফাউন্ডেশনগুলোর কাজ হবে এক ছাতার নিচে
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত ফাউন্ডেশনগুলো এতদিন নিজ নিজ ম্যান্ডেট অনুযায়ী আলাদাভাবে কাজ করেছে। কোথাও উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কোথাও দারিদ্র্য বিমোচন, কোথাও নারী উন্নয়ন কিংবা স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন পরিকল্পনায় এসব কার্যক্রমকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফাউন্ডেশনগুলোকে ক্লাস্টারভিত্তিকভাবে কাজ করানোর ফলে একই ধরনের প্রকল্পে একাধিক প্রতিষ্ঠানের কাজের পুনরাবৃত্তি কমবে এবং সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সরকার। তবে এই সমন্বয় বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই হবে পরিকল্পনার অন্যতম বড় পরীক্ষা।

‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ হবে কর্মসংস্থানের হাতিয়ার
কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে স্থানীয় অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ ধারণার আলোকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সম্ভাবনাময় পণ্যকে কেন্দ্র করে ফাউন্ডেশনগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একটি এলাকার বিশেষ পণ্যকে ঘিরে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও বিপণনের ব্যবস্থা করা গেলে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র কৃষক, নারী উদ্যোক্তা ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা গেলে কর্মসংস্থানের সুফল রাজধানী বা বড় শহরের বাইরে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।

সৌরবিদ্যুতে পাঁচ গিগাওয়াটের লক্ষ্য
কর্মসংস্থানের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে সরকার। বিদ্যুতের গ্রাহকদের শুধু ভোক্তা হিসেবে না রেখে উৎপাদক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাড়ি, প্রতিষ্ঠান কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নতুন সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার আগামী পাঁচ বছরে সৌরবিদ্যুৎ থেকে পাঁচ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

এর মধ্যে ফাউন্ডেশনগুলো ইতোমধ্যে দুই গিগাওয়াট উৎপাদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা। এই খাতে বিনিয়োগ বাড়লে সৌর প্যানেল স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তি ও কারিগরি সেবায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতেও তৈরি হবে দক্ষ জনবল
অর্থনৈতিক কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র স্বাস্থ্য খাত। দেশের রোগের ধরন বদলে যাওয়ায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করছে সরকার। একসময় সংক্রামক রোগ ছিল প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকি। এখন হৃদরোগ, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিসসহ জীবনযাপনজনিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে। ফলে শুধু চিকিৎসাকেন্দ্র বাড়ানো নয়, দক্ষ জনবল তৈরিও জরুরি। নার্স, টেকনিশিয়ান এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ তৈরিতে ফাউন্ডেশনগুলোকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে কিডনি ডায়ালাইসিস ও করোনারি কেয়ার ইউনিটের মতো সেবায় দক্ষ নার্স ও টেকনিশিয়ানের চাহিদা রয়েছে। প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে এই খাতে একদিকে সেবার মান বাড়ানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।

সামাজিক নিরাপত্তায় নতুন অর্থায়নের ভাবনা
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকেও দীর্ঘমেয়াদি ও জীবনচক্রভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিবন্ধন ও সেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তায় বিকল্প অর্থায়নের উৎস খোঁজা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যাকাতকে কীভাবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে শুধু ভাতা প্রদান নয়, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষের জন্য একটি সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা।

এক কোটি কর্মসংস্থান—কতটা বাস্তব?
সবচেয়ে বড় আকর্ষণীয় ঘোষণা এসেছে কর্মসংস্থান নিয়ে। বিভিন্ন ফাউন্ডেশন আগামী পাঁচ বছরে কী পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, সে বিষয়ে নিজেদের লক্ষ্য জানিয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা জানিয়েছেন, ২২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান একাই এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির নিশ্চয়তা দিয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য কর্মসংস্থান যোগ করলে মোট সংখ্যা এক কোটিরও বেশি হতে পারে।।তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—এই এক কোটি কর্মসংস্থানের কতটি হবে সরাসরি চাকরি, কতটি আত্মকর্মসংস্থান এবং কতটি হবে পরোক্ষ কর্মসংস্থান? এই সংজ্ঞা ও হিসাবের পদ্ধতি স্পষ্ট না হলে ভবিষ্যতে লক্ষ্য ও অর্জনের তুলনা করা কঠিন হবে। কারণ বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। তাদের জন্য শুধু চাকরি নয়, টেকসই আয় ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

লক্ষ্যের চেয়ে বড় বাস্তবায়নের পরীক্ষা
২২টি ফাউন্ডেশনের অর্থায়ন ও কাজের ধরনও এক নয়। কোনোটি সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত, কোনোটি নিজস্ব অর্থায়নে এবং কোনো প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময়ে সরকারের সহায়তা পেয়েছে। তাই তাদের এক ছাতার নিচে এনে একই অর্থনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। কিন্তু এই লক্ষ্য বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না। প্রয়োজন বিনিয়োগ, বাজার, দক্ষতা, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা। ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ সফল করতে উৎপাদনের পাশাপাশি বাজার নিশ্চিত করতে হবে। সৌরবিদ্যুতের লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগ ও গ্রিড সংযোগ বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে সেই জনবলের জন্য পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্রও তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ আগামী পাঁচ বছরে সরকারের সামনে শুধু এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নয়, সেই কর্মসংস্থানকে টেকসই ও উৎপাদনশীল করার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ২২টি ফাউন্ডেশনের সমন্বিত উদ্যোগ যদি স্থানীয় উৎপাদন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে এটি বাংলাদেশের শ্রমবাজারে বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। এখন অপেক্ষা—এক কোটি কর্মসংস্থানের বড় প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তব সাফল্যে রূপ নেয়।

কালের আলো/এম/এএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন