স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ। কাগজে-কলমে নির্বাচন নির্দলীয় হলেও মাঠের বাস্তবতায় এরই মধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই, তৃণমূলের সংগঠন শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির কাজ চলছে নেপথ্যে। ফলে জাতীয় রাজনীতির পর এবার ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌরসভাকে ঘিরে শুরু হয়েছে আরেক দফা শক্তির পরীক্ষা।
নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। সেপ্টেম্বরেই তপশিল দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। সে হিসাবে নভেম্বরের শেষ দিকে অথবা ডিসেম্বরের শুরুতে ভোট শুরুর সম্ভাবনাই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
সময়ের হিসাবেও কমিশনের চাপ
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ সময়। ইউনিয়ন পরিষদের সিংহভাগের মেয়াদ এই বছর শেষ হচ্ছে। অন্যদিকে, সম্ভাব্য বন্যা, দুর্গাপূজায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যস্ততা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা এবং আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ ভাগ থেকে রমজান—সব মিলিয়ে ভোট আয়োজনের উপযোগী সময় সীমিত। এরপর ঈদুল আজহা, গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুমও সামনে আসবে। ফলে নভেম্বর-ডিসেম্বরকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও বাস্তবসম্মত সময় হিসেবে দেখছে কমিশন। প্রথম ধাপে মেয়াদ শেষ হওয়া ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২১ সালের প্রথম ধাপে ৩৭১টি ইউনিয়নে নির্বাচন হয়েছিল। এবারও ধাপে ধাপে ভোট আয়োজনের পথেই হাঁটতে পারে কমিশন।
বিএনপির সামনে জনপ্রিয়তা থেকে ভোটে রূপান্তরের পরীক্ষা
স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিএনপির জন্য শুধু আরেকটি ভোট নয়; এটি তৃণমূল সংগঠনের কার্যকারিতা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। জাতীয় রাজনীতিতে দলটির অবস্থান ও জনপ্রিয়তা থাকলেও ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ের নির্বাচনে ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, পারিবারিক প্রভাব, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনেক বেশি ভূমিকা রাখে। এই বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় জনপ্রিয়তাকে স্থানীয় ভোটে রূপান্তর করাই বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ। দলের মন্ত্রী-এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতাদের বিভিন্ন জেলা ও সাংগঠনিক এলাকার দায়িত্ব দেওয়া, স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে কেন্দ্রকে তথ্য দেওয়ার প্রক্রিয়া তাই রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
- নির্দলীয় ভোটের আড়ালে দলগুলোর প্রস্তুতি জোরদার
- প্রার্থী বাছাই, সংগঠন গোছানো ও স্থানীয় সমঝোতায় নজর—নভেম্বর-ডিসেম্বরেই শুরু হতে পারে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস নয়; স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূলকে প্রস্তুত করার একটি কৌশলও হতে পারে। তবে দলের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ও নির্বাচন পরিচালনার ধরন স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত একে সরাসরি নির্বাচনি কৌশল হিসেবে চূড়ান্তভাবে দেখার সুযোগ নেই। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্যে অবশ্য দলের অবস্থান কিছুটা স্পষ্ট। তিনি জানিয়েছেন, দলীয় প্রতীক না থাকায় তৃণমূল ও জেলা নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিটি পদে একজন যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হবে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ প্রার্থী হলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
‘দলীয় প্রভাব থাকবে না’—সরকারের অবস্থান
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বক্তব্য, নির্বাচনে কোনো ধরনের দলীয় প্রভাব থাকবে না এবং দলীয়ভাবে প্রার্থীও দেওয়া হবে না। তবে ত্যাগী ও যোগ্য ব্যক্তিদের প্রতি সমর্থন থাকবে। এই বক্তব্যই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্নটি সামনে আনছে—নির্বাচন নির্দলীয় হলেও রাজনৈতিক দলগুলো যখন পছন্দের প্রার্থীকে সমর্থন দেবে, তখন বাস্তবে দলীয় প্রভাব কতটা এড়ানো সম্ভব হবে? কারণ প্রার্থীর পাশে দলের সাংগঠনিক শক্তি, স্থানীয় নেতাদের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক পরিচয় থাকলে প্রতীক না থাকলেও ভোটের মাঠে তার প্রভাব অস্বীকার করা কঠিন।
জামায়াতের লক্ষ্য তৃণমূলের বিস্তার
জামায়াতে ইসলামীও স্থানীয় নির্বাচনকে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে। জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে ভোটভিত্তি বাড়ানো এবং সংগঠনকে আরও দৃশ্যমান করাই দলটির অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে। তবে জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কেন্দ্রীয় জোটভিত্তিক সমঝোতার সুযোগ সীমিত। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও জোট সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আজাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয়ভাবে জোট না থাকলেও স্থানীয় প্রয়োজন বা স্থানীয় সমঝোতার ভিত্তিতে কোনো উদ্যোগ হলে তাতে দলের বাধা নেই। অর্থাৎ স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী নির্বাচনি সমীকরণ তৈরির দরজা খোলা রাখছে দলটি।
এনসিপির সামনে সংগঠন প্রমাণের সুযোগ
নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এনসিপির জন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন হতে পারে সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক পরীক্ষাগুলোর একটি। জাতীয় রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়নের যে বক্তব্য দলটি সামনে আনছে, সেটিকে বাস্তব মাঠে সংগঠনে রূপ দেওয়া এখন তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। প্রশ্ন হচ্ছে—ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত সংগঠন এবং গ্রহণযোগ্য প্রার্থী কতটা প্রস্তুত করতে পারবে এনসিপি? স্থানীয় নির্বাচনে এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে।
নির্দলীয় ভোট, রাজনৈতিক লড়াই
সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এখন আর কেবল চেয়ারম্যান-মেম্বার বা মেয়র-কাউন্সিলর নির্বাচনের বিষয় থাকছে না। জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর তৃণমূল শক্তি, স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং ভোটারদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্কের বাস্তব পরীক্ষা হতে যাচ্ছে এই নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করা। আর রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ—কেন্দ্রের নির্দেশনা ও স্থানীয় বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে প্রার্থী বাছাই করা।
নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভোটের ঘণ্টা বাজলে তাই ব্যালট বাক্সে শুধু প্রার্থী নয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোরও। জাতীয় রাজনীতির ক্ষমতার সমীকরণ এবার কতটা তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত—স্থানীয় সরকার নির্বাচনই তার সবচেয়ে বাস্তব আয়না হয়ে উঠতে পারে।
কালের আলো/এম/এএই

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬ । ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ