রাষ্ট্রীয় গুমের শিকার ও ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম বলেছেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, আপনি ভালো কিছু করতে চান। কিন্তু যে কলঙ্কজনক একটি আইন বাস্তবায়ন হতে চলেছে, সেটি যখন জনগণের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হবে, জনগণ এর জবাব দেবে। তখন এর দায় আপনাকেও বহন করতে হবে।’
সোমবার (৩১ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরসি মজুমদার মিলনায়তনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) আয়োজিত আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের আলোচনা সভায় ‘শুনতে কি পাও’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
মীর আহমদ বিন কাসেম বলেন, ‘গুমের শিকার ও নিখোঁজ স্বজনদের পরিবারের অধিকার আদায়ে সবাইকে কথা বলে যেতে হবে। যারা এখনো তাদের প্রিয়জনকে ফিরে পাননি, হয়তো তাদের অপেক্ষার আলো নিভে গেছে; কিন্তু মনের ভেতরের হাহাকার কোনোদিন যাবে না। আমাদের বলতে থাকতেই হবে। আমরা যদি আমাদের আওয়াজ যথেষ্ট জোরালো করতে পারি, হয়তো আমাদের সন্তানেরা এমন একটি বাংলাদেশ পাবে, যেখানে তারা মনের ভাব প্রকাশ করতে পারবে, কিন্তু গুমের ভয় ও আতঙ্কে থাকতে হবে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি সঠিকভাবে আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য চেষ্টা করতে পারি, হয়তো আমাদের সন্তানরা এমন একটি বাংলাদেশ পাবে, যেখানে মানুষের অধিকার হবে এই বাংলার মাটিতে সবচেয়ে পবিত্র জিনিস।’
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোতে মানবাধিকার আজ যে অবস্থানে রয়েছে, তা একদিনে অর্জিত হয়নি। শত শত বছরের ত্যাগ, তিতিক্ষা, আন্দোলন, ঘাম ও রক্তের বিনিময়ে সেখানে মানবাধিকার একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হলেও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখনো শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে। প্রতিটি চেষ্টা, বক্তব্য ও কাজ তিলে তিলে এমন একটি কাঠামো তৈরি করবে, যেখানে বাংলাদেশের সন্তানরা নিরাপদে বসবাস করতে পারবে।
তরুণদের দেশত্যাগের প্রবণতার প্রসঙ্গে মীর আহমদ বিন কাসেম বলেন, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার একটি জরিপে ১৭ থেকে ৩০ বছর বয়সি তরুণদের মধ্যে স্থায়ীভাবে দেশত্যাগের আকাঙ্ক্ষার কথা উঠে এসেছে। এ জন্য তরুণদের দোষ দেওয়া যায় না। কারণ, যারা জনগণের সেবায় ছিলেন, তারা তরুণদের সামনে দেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
বর্তমান সরকারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, শহীদের কবর, সন্তানহারা মায়ের চোখের পানি এবং অসংখ্য মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণের ফলেই আজকের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে প্রত্যাখ্যান করা এবং জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে প্রতারণা করার পরিণতি আবারও সামনে আসবে।
প্রস্তাবিত মানবাধিকার কমিশন আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি একজন ভিক্টিম হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখতে পারছি না। এমন একটি কমিশন বাস্তবে কার্যকর না হয়ে শুধু কাগজে-কলমে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
বিন কাসেম বলেন, এখনো আইনটি সংসদে পাস হয়নি। তাই শেষবারের মতো চেষ্টা করার সুযোগ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষকে এ বিষয়ে আওয়াজ তোলার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমি অন্তত একজন ভিক্টিম ও জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে যেখানে সুযোগ পেয়েছি, কথা বলে গেছি। সংসদে কথা বলেছি এবং বলব। একদিন যদি আইনটি পাস হয়ে যায়, তখন অন্তত নিজের বিবেকের কাছে এই সান্ত্বনা থাকবে যে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।’
জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে বিন কাসেম বলেন, জুলাই বিপ্লব মানুষকে আবার স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। নেতৃত্ব ব্যর্থ হলে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের অধিকার রক্ষায় দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে জনগণের জোয়ারই আবার বাংলাদেশকে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দেখাবে।
তিনি বলেন, ‘হয়তো এমন রক্তক্ষয় হোক—আল্লাহ আমাদের সেদিন থেকে রক্ষা করুন। তবে ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, নিরাশ হওয়া যাবে না। আমি আশাবাদী, বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে।’
কাসেম আরও বলেন, ‘আমার সন্তান এমন একটি বাংলাদেশ পাবে, যেখানে তার অধিকার কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। তার পেছনে যত বড় রাজনৈতিক দলই থাকুক, যত শক্তিশালী পরাশক্তিই তাকে সহায়তা করুক এই বাংলার মাটিতে বাংলার মানুষের অধিকারই হবে সবচেয়ে পবিত্র জিনিস।’
কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬ । ৬:৫৫ অপরাহ্ণ