জেজু দ্বীপ: যেখানে পাথর, সমুদ্র আর নারীর সাহস বলে গল্প

ভ্রমণ ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৪:০৪ অপরাহ্ণ

চলতি বছরের এপ্রিলে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড জার্নালিজম কনফারেন্সে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাংবাদিকদের সঙ্গে নতুন ভাবনা, অভিজ্ঞতা ও গল্প বিনিময়ের পর আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত জেজু দ্বীপ।

দ্বীপটিতে পা রাখার পরই এর প্রকৃতি ও সংস্কৃতি মুগ্ধ করে। স্থানীয়ভাবে জেজুকে বলা হয় ‘সামদাদো’—অর্থাৎ ‘তিন অনেকের দ্বীপ’। এখানকার তিনটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—ভূদৃশ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য পাথর, শক্তিশালী নারীদের ঐতিহ্য এবং উপকূলজুড়ে বয়ে চলা প্রবল বাতাস।

জেজুর আগ্নেয়গিরির উৎপত্তির চিহ্ন দ্বীপের প্রায় সর্বত্রই চোখে পড়ে। কোটি কোটি বছর আগে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে গড়ে ওঠা এই দ্বীপে রয়েছে কালো ব্যাসল্ট পাথর, আগ্নেয়গিরির গর্ত এবং সুউচ্চ খাড়া পাহাড়।

এই আগ্নেয় ঐতিহ্য কাছ থেকে দেখার অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান জেজু স্টোন পার্ক। বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা এই পার্কের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ‘ডল হারেউবাং’ বা ‘পাথরের দাদু’—আগ্নেয় পাথর দিয়ে তৈরি বিশেষ ভাস্কর্য। শান্ত ও জ্ঞানী অভিব্যক্তির এসব মূর্তি দীর্ঘদিন ধরে জেজুর মানুষ ও ভূমির রক্ষক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

এসব পাথরের মূর্তির পাশে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, তারা যেন নীরবে দ্বীপটির বহু বছরের ইতিহাসের সাক্ষ্য দিচ্ছে। এগুলো শুধু পুরোনো নিদর্শন নয়; বরং জেজুর মানুষের সংগ্রাম, আধ্যাত্মিকতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্কের গল্পও বলে।

স্টোন পার্কে রয়েছে মনোরম হাঁটার পথ এবং পুরোনো জেজুর বাড়ির পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী একটি গ্রাম। খড়ের ছাউনি দেওয়া এসব বাড়ি শুধু জাদুঘরের অংশ নয়, বরং দ্বীপটির অতীত জীবনের একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

এই স্থানটি ‘জিসিউল’ চলচ্চিত্র এবং নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় সিরিজ ‘হোয়েন লাইফ গিভস ইউ ট্যানজারিনস’-এর শুটিং লোকেশন হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। সিরিজটির আরও বেশ কিছু দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে জেজুর গিমনিয়ং উপকূল, হাদো জেলেপল্লি এবং সিওংসান ইলচুলবংয়ের মতো মনোমুগ্ধকর স্থানেও।

জেজু ভ্রমণের অন্যতম শান্ত অভিজ্ঞতা ছিল হানদাম কোস্টাল ট্রেইলে হাঁটা। গওয়াকজি বিচ থেকে হানদাম বিচ পর্যন্ত প্রায় ১ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথটি সমুদ্রের পাশ দিয়ে চলে গেছে। সুন্দরভাবে নির্মিত এই পথটি হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্যও উপযোগী।

হাঁটার সময় এক পাশে বিস্তৃত নীল সমুদ্র, অন্য পাশে কালো আগ্নেয় পাথর। ঢেউয়ের মৃদু শব্দের সঙ্গে মিশে যায় সমুদ্রের বাতাস আর বুনো ফুলের হালকা সুবাস। ব্যস্ত জীবনের কোলাহল থেকে যেন মুহূর্তেই দূরে নিয়ে যায় এই পথ।

অনেক পর্যটককে পথের পাশের ক্যাফেতে বসে কফি পান করতে কিংবা নিরিবিলি পরিবেশে কিছুক্ষণ সময় কাটাতে দেখা যায়। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় উপকূলীয় পথে হাঁটার অভিজ্ঞতা থাকলেও হানদাম ট্রেইলের এই শান্ত ও ঘনিষ্ঠ আবহ একে আলাদা করে তুলেছে।

তবে জেজুর সৌন্দর্য শুধু প্রকৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। দ্বীপটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হলো ‘হেনিয়ো’—শত শত বছর ধরে আধুনিক ডাইভিং সরঞ্জাম ছাড়াই সমুদ্রে ডুব দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসা নারী ডুবুরিরা।

হেনিয়োদের সঙ্গে সরাসরি দেখা না হলেও তাদের ইতিহাস ও জীবনযাপন সম্পর্কে জানার অভিজ্ঞতা গভীরভাবে নাড়া দেয়। ষাটের কোঠা পেরোনো অনেক নারীও ঠান্ডা পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুব দিয়ে সামুদ্রিক শৈবাল, অ্যাবালোন, ঝিনুকসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক সম্পদ সংগ্রহ করেন। এসব সামুদ্রিক সম্পদ জেজুর অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

হেনিয়ো সংস্কৃতিতে প্রকৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও টেকসইভাবে সামুদ্রিক সম্পদ আহরণের চর্চা রয়েছে। পানির নিচ থেকে উঠে আসার সময় তাদের মুখ থেকে বের হওয়া বিশেষ শিস—‘সুমবিসোরি’—সহকর্মী ডুবুরিদের জন্য সংকেত হিসেবে কাজ করে। একই সঙ্গে এই শব্দ জেজুর সমুদ্রজীবনের এক অনন্য সুর হিসেবেও পরিচিত।

হেনিয়ো সংস্কৃতিকে ইউনেস্কো বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ‘অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। নেটফ্লিক্সের ‘হোয়েন লাইফ গিভস ইউ ট্যানজারিনস’ সিরিজেও তাদের জীবন, সংগ্রাম ও অবদানের গল্প তুলে ধরা হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে এই নারীদের সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি করেছে।

জেজু দ্বীপ তাই শুধু একটি পর্যটন গন্তব্য নয়। এখানে প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাস এমনভাবে একে অপরের সঙ্গে মিশে আছে, যা ভ্রমণকারীকে থেমে ভাবতে শেখায়। প্রাচীন পাথরের মাঝে হাঁটা, হানদাম ট্রেইলে সমুদ্রের নোনা বাতাস অনুভব করা কিংবা হেনিয়ো নারীদের সাহস ও সংগ্রামের গল্প শোনা—এসব অভিজ্ঞতা দ্বীপ ছেড়ে আসার পরও মনে থেকে যায়।

অ্যাডভেঞ্চার, প্রশান্তি কিংবা সংস্কৃতির গভীরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা—যে কারণেই ভ্রমণ করা হোক, জেজু তার নিজস্ব সৌন্দর্য ও গল্প দিয়ে পর্যটককে আকর্ষণ করে। দ্বীপটি মনে করিয়ে দেয়, শক্তি অনেক সময় লুকিয়ে থাকে টিকে থাকার ক্ষমতায়; পাথর ও সমুদ্রও গল্প বলতে পারে। আর কখনো কখনো সামনে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো একটু থেমে যাওয়া।

কালের আলো/এসএ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন