ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পা রাখলেই চোখে পড়ে রোগীর উপচে পড়া ভিড়। নির্ধারিত আসনের দ্বিগুণেরও বেশি রোগী ভর্তি থাকায় ওয়ার্ড তো বটেই, সিঁড়ির ফাঁকা জায়গা কিংবা হাসপাতালের বিভিন্ন কোণেও চলছে চিকিৎসা। কোথাও স্বজনের উৎকণ্ঠা, কোথাও রোগীর কষ্ট—আবার কোথাও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার আনন্দাশ্রু।
এই ব্যস্ততা আর গুমোট পরিবেশের মাঝেই যেন এক টুকরো স্বস্তির দ্বীপ ঢামেকের প্রশাসনিক ব্লকের বাগান। চারপাশে সবুজ, নানা রঙের ফুল আর পুরোনো বড় বড় গাছের ছায়ায় কিছুটা সময় কাটিয়ে ক্লান্তি ভুলছেন রোগী ও তাদের স্বজনেরা।
হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে বৈদ্যুতিক পাখা থাকলেও প্রচণ্ড গরম এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপে ভেতরের পরিবেশ অনেক সময় অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। তাই সন্ধ্যা নামার পর হাসপাতালের ভেতর থেকে অনেকেই ছুটে আসেন এই বাগানে। কেউ বেঞ্চে বসে থাকেন, কেউ হাঁটেন, আবার কেউ সন্তানকে নিয়ে কিছুটা সময় কাটান।
সন্ধ্যায় দুই বছরের শিশু সন্তান নিহালকে নিয়ে বাগানে খুনসুটিতে মেতে উঠেছিলেন মাজিদুল। তার বোন ভর্তি রয়েছেন হাসপাতালের নতুন ভবনে। তিনি বলেন, প্রচণ্ড গরমে হাসপাতালের ভেতরে থাকা খুব অস্থির লাগে। বাগানটির কথা জানতে পেরে সন্তানকে নিয়ে সন্ধ্যায় এখানে আসেন। মাজিদুলের ভাষায়, ‘দারুণ জায়গা। জায়গাটা আসলেই খুব সুন্দর। নানা রকম ফুল ও সবুজে ঘেরা।’
এর কিছুক্ষণ পর বাগানের ভেতর দিয়ে এক ব্যক্তিকে শিশুর হাত ধরে হাঁটতে দেখা যায়। দেখে বোঝা যায়, তিনিও সন্তানকে নিয়ে একটু স্বস্তির সময় কাটাতে এসেছেন। দুই শিশুর বয়সই আনুমানিক দেড় থেকে দুই বছর।
শুধু শিশুদের নিয়ে আসা স্বজনই নন, হাসপাতালের অনেক রোগী ও স্বজনকে বাগানের বেঞ্চে বসে থাকতে দেখা যায়। কেউ নীরবে বিশ্রাম নিচ্ছেন, কেউ স্বজনের সঙ্গে কথা বলছেন। হাসপাতালের কোলাহল থেকে কয়েক মুহূর্ত দূরে এই সবুজ পরিসরটুকুই যেন তাদের মানসিক প্রশান্তির জায়গা।
ঢামেক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই প্রশাসনিক ব্লক চত্বরের এই বাগান হাসপাতালের সৌন্দর্য বাড়িয়ে আসছে। বাগান ঘিরে রয়েছে অতি পুরোনো আমগাছসহ বিভিন্ন ফলদ বৃক্ষ। পাশাপাশি রয়েছে গোলাপ, জবা, বেলি, কাঠগোলাপসহ প্রায় ৫০ ধরনের ফুল ও পাতাবাহার গাছ। অল্প পরিসরে গড়ে তোলা হয়েছে একটি ভেষজ বাগানও; রয়েছে বিভিন্ন ঔষধি গাছ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও রোগী ও স্বজনদের কথা বিবেচনায় নিয়ে নিয়ম মেনে বাগানটি উন্মুক্ত রাখে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা রাত পর্যন্ত এখানে থাকা মানুষদের নিরাপত্তা দেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সরকারি মালির মাধ্যমে নিয়মিত বাগানটির পরিচর্যা করা হয়। রোগী ও স্বজনেরা প্রচণ্ড গরমের মধ্যে রাত পর্যন্ত এখানে বসে থাকেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের চিন্তাভাবনা আছে, বাগানটি আরও সুন্দর করা হবে। চারপাশে বসার জন্য বেঞ্চ তৈরি করাসহ নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
প্রতিদিন যেখানে জীবন-মৃত্যুর কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় হাজারো মানুষকে, সেখানে ঢামেকের এই ছোট্ট সবুজ বাগান যেন অন্য এক গল্প বলে। চিকিৎসার চাপ, উৎকণ্ঠা আর গুমোট পরিবেশের মধ্যেও কয়েক মুহূর্তের জন্য এখানে পাওয়া যায় প্রশান্তির নিঃশ্বাস—সবুজের ছায়ায়, ফুলের সুবাসে।
কালের আলো/এম/এএইচ

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ