চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে একটি অভিন্ন লক্ষ্যে এক হয়েছিল বিভিন্ন দল। রাজপথের সেই ঐক্যই শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে শক্তি দিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের মাত্র ছয় মাসের মাথায় সেই রাজনৈতিক সমীকরণে এসেছে বড় পরিবর্তন। একসময়ের আন্দোলনের সহযোদ্ধারা এখন ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানে। ত্রয়োদশ ভোটে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি এখন সরকারে।
- একসময় একই আন্দোলনের সহযোদ্ধা এখন একজন সরকারে অন্যজন বিরোধী শিবিরে
- ছয় মাসেই রাজপথের কর্মসূচি—এই বিভাজন কি জুলাইয়ের শক্তিকেই দুর্বল করছে?
একসময় তাদের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামী এখন সংসদের প্রধান বিরোধী দল। আর বিরোধী দলের নেতৃত্বে থাকা ১১ দলীয় জোট ইতোমধ্যে সংসদের বাইরে ধারাবাহিক কর্মসূচিতে নেমেছে। শনিবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চও হয়েছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের দাবি। এখন প্রশ্ন উঠছে, নতুন সরকারের ছয় মাসের মধ্যেই রাজপথের বড় কর্মসূচিতে যাওয়া কতটা যৌক্তিক?
জনস্বার্থে চাপ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ জায়গা সংসদ
বিরোধী দলের আন্দোলনের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন নেই। গণতন্ত্রে সরকারকে প্রশ্ন করা, সমালোচনা করা এবং জনস্বার্থে চাপ তৈরি করা বিরোধী দলের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু সেই চাপের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা সংসদ। বর্তমান সংসদে বিরোধী দলের প্রশ্ন তোলা, প্রস্তাব দেওয়া, বিতর্ক করা এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা বা প্রশাসনিক নানা সমস্যার সমাধানে সরকারকে কিছুটা সময় দেওয়া যেত—এমন মতও রয়েছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বিরোধী দলকে নীরব থাকতে হবে। বরং সংসদের ভেতরে ধারাবাহিক চাপ তৈরি করে, নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে এবং সরকারের অগ্রগতি মূল্যায়ন করে প্রয়োজনে রাজপথে যাওয়ার পথ খোলা রাখা যেত। এতে একদিকে বিরোধী দলের সাংবিধানিক ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হতো, অন্যদিকে সরকারেরও কাজ করার সুযোগ বাড়ত।
সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান বাস্তবসম্মত নয়
বিরোধী দলের ছয় দফার মধ্যে জুলাই গণহত্যার বিচার কিংবা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন অন্যতম। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, আইনশৃঙ্খলা বা দুর্নীতি—এসব দীর্ঘদিনের সমস্যা। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রত্যাশিত হলেও সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান বাস্তবসম্মত নয়। তাই রাজনৈতিকভাবে সব দাবিকে একই মাত্রার চাপের মধ্যে নিয়ে আসার বদলে কোন বিষয়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ প্রয়োজন আর কোন বিষয়ে সময় দেওয়া যায়—এই পার্থক্যটিও গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্যই এসব বিষয় ভেবে দেখা উচিত।
বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা
বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কের পরিবর্তন। একসময় দুই দল ছিল রাজনৈতিক মিত্র। এখন বিএনপি সরকারে, জামায়াত বিরোধী শিবিরের নেতৃত্বে। ফলে পুরোনো মিত্রতার জায়গায় এসেছে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। যদিও বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি। জনগণের ম্যান্ডেট পেয়ে জনকল্যাণেই নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি সমস্যাসমূহ সমাধানে চেষ্টা করছেন। এদিকে, লংমার্চে বিরোধী দলের নেতাদের কঠোর বক্তব্যের পাল্টা জবাবও এসেছে সরকারি দলের নেতাদের কাছ থেকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সতর্ক করে বলেছেন, চলমান সংকটকে পুঁজি করে কেউ বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইলে তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আইনে রয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও সরকারের সমালোচনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এমন বাস্তবতায় দু’পক্ষের মধ্যে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা দেখছেন বিশ্লেষকরা।
জুলাইয়ের ঐক্য ফাটলে লাভ ক্ষতি
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বহুমতের ঐক্য। ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের দলগুলো একটি অভিন্ন লক্ষ্য সামনে রেখে একসঙ্গে দাঁড়িয়েছিল। সেই ঐক্যের কারণেই আন্দোলন একটি ব্যাপক গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। এখন সেই শক্তিগুলোই যদি ক্ষমতার পালাবদলের পর দ্রুত পরস্পরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়, তাহলে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাগুলো বাস্তবায়নের পথ কঠিন হতে পারে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, সরকার ও বিরোধী দল একসময় একই রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশীদার ছিল। তাই তাঁদের কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশা ছিল জাতীয় সমস্যাগুলো সমাধানে সহযোগিতার। বিরোধী দলের দায়িত্ব সরকারের ত্রুটি তুলে ধরা, তবে একই সঙ্গে গঠনমূলক প্রস্তাবও দিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্র হওয়া উচিত জনস্বার্থ। তাঁর মতে, ক্ষমতার পরিবর্তন বা রাজনৈতিক বিরোধ—সবকিছুর সমাধান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই হওয়া প্রয়োজন। দুই বিশ্লেষকের বক্তব্যের মধ্যে একটি অভিন্ন বার্তা আছে—সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা যেমন জরুরি, বিরোধী দলের আন্দোলনকেও দায়িত্বশীল ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক রাখা তেমনই জরুরি।
পারস্পরিক অবিশ্বাসে ক্ষতি হবে রাষ্ট্রের
সরকার ও বিরোধী দল যে আলাদা অবস্থানে থাকবে, সেটিই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম। মতপার্থক্য থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও থাকবে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি এমন পর্যায়ে যায়, যেখানে পারস্পরিক অবিশ্বাসই রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, তাহলে ক্ষতি হবে রাষ্ট্রের। বিশেষ করে জুলাইয়ের আন্দোলনের শক্তিগুলোর মধ্যে অনৈক্য যত বাড়বে, ততই সেই আন্দোলনের অভিন্ন লক্ষ্যগুলো আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। সরকার বিরোধী দলের প্রশ্ন ও সমালোচনাকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নিয়েছে। এখন বিরোধী দলের জন্যও জরুরি হবে সংসদকে কার্যকর রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা এবং প্রয়োজন হলে ধাপে ধাপে রাজপথে যাওয়া। কারণ সরকার ও বিরোধী দল দুটিই গণতন্ত্রের অংশ। একজনের দুর্বলতায় অন্যজন শক্তিশালী হয় না; বরং দুর্বল হয় পুরো ব্যবস্থাই। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান যে রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে এক করেছিল, ছয় মাস পর তাদের সামনে এখন নতুন পরীক্ষা—তারা কি ক্ষমতার প্রতিযোগিতার মধ্যেও জুলাইয়ের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষাকে অক্ষুণ্ন রাখতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বিএনপি বা জামায়াতের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণ করবে না; নির্ধারণ করবে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতির চরিত্রও।
কালের আলো/এম/এএইচ

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৭:৪৯ অপরাহ্ণ