ভেনিসে বাঁধনের ওপর হামলা: শোবিজে তীব্র ক্ষোভ, প্রতিবাদের ঝড়

বিনোদন ডেস্ক:
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৯:৩৭ অপরাহ্ণ

ইতালির ভেনিসে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে হামলা ও হেনস্তার অভিযোগ তুলেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মেস্ত্রে শহরের একটি পার্কে অবস্থানকালে একদল ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও হেনস্তা করার অভিযোগ করেছেন তিনি। এ ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে দেশের শোবিজ অঙ্গন। শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বাঁধনের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

‘একজন বাঁধনকে দমানো এত সহজ হবে না’
হামলার পর নিজের ফেসবুক লাইভে এসে ঘটনার বিস্তারিত জানান বাঁধন। তার অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণেই তাকে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্য করা হয়েছে। বাঁধন জানান, তার শরীরে পানি ও কোমল পানীয় ছুড়ে মারা হয়। তার গায়ে হাত তোলা, মোবাইল ফোন ফেলে দেওয়া এবং কানের পাশেও আঘাত করার অভিযোগ করেন তিনি। এ সময় তার ভাইয়ের স্ত্রীকেও ধাক্কা দেওয়া হয়। পরিবারের সঙ্গে থাকা একটি শিশুও পুরো ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

অভিনেত্রীর দাবি, হামলাকারীদের কয়েকজন নিজেদের নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী এবং ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ হিসেবে পরিচয় দেন। তাকে জোর করে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলার জন্যও চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। বাঁধন স্পষ্ট করে বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হলেও নিজের অবস্থান থেকে তিনি সরে যাবেন না। তার ভাষায়, ‘একজন আজমেরী হক বাঁধনকে দমানো এত সহজ হবে না।’

ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই তীব্র প্রতিক্রিয়া
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ভিডিওতে কয়েকজনকে বাঁধনের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করতে এবং তাকে ‘জুলাই জঙ্গি’ বলতে শোনা যায়। ভিডিওটি সামনে আসার পর বাঁধনের প্রতি সংহতি জানিয়ে সরব হয়ে ওঠেন দেশের অভিনয় ও সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেকে। তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে শিল্পীর স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্যেও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করার দাবি।

‘অপমান নয়, একজন শিল্পীর প্রাপ্য সম্মান ও নিরাপত্তা’
বাঁধনের পাশে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী সাফা কবির। তিনি জানিয়েছেন, ঘটনায় তিনি ভীষণভাবে মর্মাহত, ক্ষুব্ধ এবং লজ্জিত। সাফার মতে, কোনো শিল্পীরই এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া উচিত নয়। দেশের বাইরে চলচ্চিত্র উৎসবে নিজের চলচ্চিত্র ও দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাওয়া একজন শিল্পীর প্রাপ্য সম্মান ও নিরাপত্তা—অপমান, হয়রানি কিংবা আতঙ্ক নয়।

দেশের শিল্পীদের বারবার রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে টেনে আনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। সাফা বলেন, শিল্পীরা সত্য, ন্যায় ও মানুষের কথা বলবেন—এটাই তাদের স্বাধীনতা। সেই কণ্ঠের কারণে একজন শিল্পীকে কেন বারবার মূল্য দিতে হবে, সেই প্রশ্নও রাখেন তিনি। তার ভাষায়, ‘একজন শিল্পীর কণ্ঠ, সম্মান ও নিরাপত্তা কখনোই রাজনীতির মূল্য হওয়া উচিত নয়।’ একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বাঁধনের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

‘তীব্র নিন্দা জানাই’—প্রভার প্রতিবাদ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন ছোটপর্দার অভিনেত্রী সাদিয়া জাহান প্রভা। এক পোস্টে তিনি ইতালিতে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানান।

বাঁধনকে কেন সহজ টার্গেট করা হলো, প্রশ্ন দীপ্তির
দীপ্তির দাবি, জুলাইয়ের আন্দোলনে বাঁধনের অবস্থান, শিশু হত্যার প্রতিবাদে রাজপথে থাকা এবং কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় না থাকাই তাকে সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। নারী হওয়ার কারণেও তাকে সহজ টার্গেট করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। জুলাই আন্দোলনের অংশীদারিত্ব দাবি করা রাজনৈতিক দলগুলো এ ঘটনায় কী ব্যবস্থা নেয়, সেই প্রশ্নও তুলেছেন দীপ্তি।

ভিডিও শেয়ার করে ক্ষোভ পরীমণির
চিত্রনায়িকা পরীমণিও ঘটনার ভিডিও শেয়ার করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি কার্যত শিল্পীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নটিই সামনে এনেছেন। দেশের বাইরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাওয়া একজন শিল্পীর সঙ্গে এমন আচরণে শোবিজ অঙ্গনের ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে।

‘কিছুই ঠিক হচ্ছে না’—মমের উদ্বেগ
অভিনেত্রী জাকিয়া বারী মমও বাঁধনকে হেনস্তার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। নারী ও শিশু নির্যাতন, খুন, সন্ত্রাস এবং নারীর প্রতি অসম্মানের মতো বিষয়গুলো সামনে এনে মম প্রশ্ন তুলেছেন, পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে। তার ভাষায়, ‘কিছুই ঠিক হচ্ছে না!

এই কর্মকাণ্ডগুলোর কোনোটাই ভালো হচ্ছে না’
মডেল, অভিনেত্রী ও আইনজীবী পিয়া জান্নাতুলও এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নারী ও শিল্পীদের প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান নিষ্ঠুরতা ও সংবেদনহীনতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন তিনি।

নিরাপদে আছেন বাঁধন, যোগাযোগ কনস্যুলেটের
এদিকে ঘটনার পর সরকারি পর্যায়েও যোগাযোগ শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব কে এম নাজমুল হক জানিয়েছেন, আজমেরী হক বাঁধনের সঙ্গে তার কথা হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে নিরাপদে আছেন। মিলানে অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে। কনস্যুলেটের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাঁধনের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ভেনিসে বাংলাদেশের প্রতিনিধি বাঁধন
‘রেহানা মরিয়ম নূর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পাওয়া আজমেরী হক বাঁধন বর্তমানে ৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার প্রদর্শনীতে অংশ নিতেই ইতালিতে গেছেন তিনি। কিন্তু দেশের সিনেমা ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে বিদেশের মাটিতে হামলা ও হেনস্তার অভিযোগ এখন শুধু বাঁধনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে বাংলাদেশের শিল্পীদের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সীমা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তির প্রশ্নও।

তদন্তেই মিলবে ঘটনার প্রকৃত চিত্র
শোবিজ অঙ্গনের তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভের মধ্যে এখন মূল অপেক্ষা ইতালির তদন্তের দিকে। হামলার প্রকৃত কারণ কী ছিল, ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় কী এবং অভিযোগের সত্যতা কতটা—তদন্তের মাধ্যমে সেসব স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষা।

একই সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ইতালির আইন অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিও এখন দেখার বিষয়। একজন শিল্পী হিসেবে বাঁধনের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি ইতোমধ্যেই জোরালো হয়েছে দেশের শোবিজ অঙ্গনে।

কালের আলো/এম/এএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন