২০২৬ থেকে ৮০-এর দশকে—নস্টালজিয়ার নতুন ঠিকানা এআই

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৭:২৬ অপরাহ্ণ

একটা ছবি। ফিকে রং। দানা দানা গ্রেইন। লম্বা চুল, চওড়া কাঁধের ব্লেজার, বড় কানের দুল—দেখলে মনে হবে, ছবিটি হয়তো তোলা হয়েছিল চার দশক আগে। কিন্তু ছবির মানুষটি? তিনি ২০২৬ সালেরই একজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন এমন ছবিই ছড়িয়ে পড়ছে। ‘আমি যদি আশির দশকে থাকতাম, কেমন দেখাতাম?’—এই কৌতূহল থেকেই নিজেদের বর্তমান ছবিকে এআইয়ের সাহায্যে আশির দশকের চরিত্রে রূপ দিচ্ছেন নেটিজেনরা।

চুল বদলে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে পোশাক। যোগ হচ্ছে পুরোনো গাড়ি, ঘরের সাজ, সিনেমার পোস্টারের মতো ব্যাকগ্রাউন্ড। এমনকি ছবির রং ও সেই সময়ের ক্যামেরার দানাদার আবহও তৈরি করে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

সেপ্টেম্বরের শুরুতে আলোচনায় আসা এই ট্রেন্ড কয়েক দিনের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি তারকারাও যোগ দিয়েছেন এই রেট্রো যাত্রায়।

কিন্তু ২০২৬-এর মানুষ হঠাৎ কেন ফিরে তাকাচ্ছে ১৯৮০-এর দিকে?

যে দশকে ‘বেশি’ই ছিল ফ্যাশন

আশির দশক ছিল বাড়াবাড়ির দশক। আজকের ফ্যাশনে যেখানে ‘লেস ইজ মোর’—সেখানে আশির দশকের মন্ত্র যেন ছিল, ‘মোর ইজ মোর।’ চওড়া কাঁধ, বড় চুল, উজ্জ্বল রং, বড় কানের দুল, মোটা বেল্ট আর চোখে পড়ার মতো পোশাক—সবকিছুতেই ছিল আলাদা করে নজর কাড়ার চেষ্টা।

পোশাক তখন শুধু শরীর ঢাকার উপকরণ ছিল না; পোশাকই হয়ে উঠেছিল নিজের পরিচয় জানান দেওয়ার ভাষা। বাংলাদেশেও আশির দশক ছিল ফ্যাশনের পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। নারীদের পোশাকে শুরু হয় নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। জনপ্রিয় হয়ে ওঠে পোলকা ডট, হল্টার-নেক ব্লাউজ, বড় হুপ কানের দুলসহ নানা স্টাইল।

শাড়িতে আশির দশকের লুকে ছবি – অভিনেত্রী বুবলীর
ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

হিন্দি সিনেমার নায়িকাদের প্রভাব ছিল বেশ শক্তিশালী। শাড়ির নকশা ও বুননেও আসে পরিবর্তন। জনপ্রিয় হয় ডিজাইনার শাড়ি, নকশিকাঁথার এমব্রয়ডারি ও টাই-ডাই। কামিজ, ব্লাউজ কিংবা টপ—যাই হোক, কাঁধ ও হাতার নকশায় থাকত বাড়তি আয়োজন।

অভিনেত্রী বিদ্যা সিনহা মিম লিখেছেন, আশির দশকের লুক।
ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

পুরুষদের ফ্যাশনেও আসে পরিবর্তন। শার্ট, ট্রাউজার ও ডেনিমের পশ্চিমা প্রভাব বাড়তে থাকে। তবে পাঞ্জাবি, ফতুয়া, লুঙ্গি কিংবা স্যান্ডো গেঞ্জিও নিজেদের জায়গা ধরে রাখে। আর ঢাকার নিউমার্কেট, সায়েন্স ল্যাবরেটরি ও এলিফ্যান্ট রোড হয়ে ওঠে ফ্যাশনের পরিচিত গন্তব্য। অর্থাৎ আশির দশকে বাংলাদেশে ফ্যাশন শুধু পোশাকের বিষয় ছিল না—ধীরে ধীরে এটি হয়ে উঠছিল একটি শিল্প ও ব্যবসা।

গায়িকা জেফার রহমান লিখেছেন, ইন্টারনেটের আশির দশকের এই পার্টিতে এইমাত্র যোগ দিলাম!
ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

তখনকার ইনফ্লুয়েন্সার ছিলেন নায়ক-নায়িকারা

আজকের মতো তখন ইনস্টাগ্রাম ছিল না। টিকটক ছিল না। ছিল না ফ্যাশন ইনফ্লুয়েন্সারের দুনিয়া। তখন একজন মানুষের পোশাকের ধরন বদলে দিতে পারত একটি সিনেমা অথবা একটি গান অথবা টেলিভিশনে দেখা কোনো তারকার চুলের স্টাইল।

১৯৮১ সালে এমটিভি চালুর পর গান আর ফ্যাশনের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। কিন্তু নতুন কোনো ফ্যাশন ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগত। সিনেমা ও টেলিভিশন থেকে সেটি যেত ম্যাগাজিনে, তারপর বাজারে।

অমিতাভ বচ্চন, শ্রীদেবী, রেখা, পারভিন ববি—বলিউডের তারকারা ছিলেন তরুণদের স্টাইল আইকন। বাংলাদেশেও রুনা লায়লা, কবরী, ববিতা ও জাফর ইকবালের মতো তারকারা তৈরি করেছিলেন নিজস্ব ফ্যাশন প্রভাব।তরুণীদের মধ্যে ববিতার ফোলা চুলের স্টাইল ছিল বেশ আলোচিত।

আর মিঠুন চক্রবর্তীর ‘ডিস্কো ড্যান্সার’ যেন ফ্যাশনে নিয়ে আসে অন্যরকম ঝড়। ঝলমলে পোশাক, টাইট প্যান্ট, জ্যাকেট, বেল্ট—ডিস্কো লুক হয়ে ওঠে তরুণদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্র। শ্রীদেবী ও রেখার সিনেমার গান থেকেও অনুপ্রেরণা নিতেন তরুণীরা। শাড়ির সঙ্গে স্টাইলিশ ব্লাউজ, বড় দুল, চুড়ি আর নানা ধরনের হেয়ারস্টাইল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

পারভিন ববির পশ্চিমা পোশাক, জাম্পস্যুট, বড় সানগ্লাস ও টাইট ট্রাউজার শহুরে ফ্যাশনেও প্রভাব ফেলে। দেশীয় সিনেমায় জাফর ইকবাল হয়ে ওঠেন তরুণদের অন্যতম স্টাইল আইকন। আর ১৯৮৯ সালে ‘বেদের মেয়ে জোস্‌না’ মুক্তির পর অঞ্জু ঘোষের সাজেও তৈরি হয় ব্যাপক আগ্রহ। রুপার গয়না, বড় টিপ ও গ্রামীণ ঘরানার পোশাক ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা প্রান্তে।

চার দশক পর আবার কেন?

পুরোনো ফ্যাশন নতুন করে ফিরে আসা নতুন কিছু নয়। ফ্যাশনের জগতে রেট্রো বারবার ফিরে আসে। কখনো সত্তর, কখনো নব্বই, কখনো আবার আশির দশক। তবে এবারের গল্পটা একটু অন্যরকম। কারণ এবার শুধু পোশাক ফিরছে না—ফিরছে একটি পুরো সময়ের অনুভূতি।

এ যুগের মডেল ফয়সাল খান নীলের ৮০’র দশকের সেই ওভারসাইজ ব্লেজার
ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

 

নজর কাড়া একটি ছবি প্রকাশ করে ক্যাপশনে পূর্ণিমা লিখেছেন, নতুন ট্রেন্ড
ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

ওভারসাইজড ব্লেজার, শোল্ডার প্যাড, হাই-ওয়েস্টেড জিনস, লেদার জ্যাকেট, বড় অ্যাকসেসরিজ—আশির দশকের অনেক কিছুই এখনকার ফ্যাশনে নতুন করে জায়গা করে নিয়েছে। আর এই নস্টালজিয়ার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে জেন-জি।

অভিনেত্রী তানজিকা আমিন ছবিটি প্রকাশ করে লিখেছেন, গা ভাসাইলাম
ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

 

অভিনেতা জিয়াউল ফারুক অপূর্ব লিখেছেন, ট্রেন্ডের সাথে তাল মিলিয়ে! আশির দশকের একজন অভিনেতা হলে যেমনটা হতো।
ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

মজার বিষয় হলো—এই প্রজন্মের অনেকেই আশির দশক দেখেইনি। তবু সেই সময়ের প্রতি তাদের টান। নিজে যে সময়ে কখনো বেঁচে থাকেনি, সেই সময়ের প্রতি নস্টালজিয়াকে বলা হয় ‘অ্যানিমোইয়া’। অর্থাৎ নিজের নয়, তবু নিজের মতো মনে হওয়া কোনো অতীতের প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ।

অভিনেত্রী মাসুমা রহমান নাবিলা লিখেছেন, কালজয়ী গান আর পুরোনো দিনের স্টাইলের সেই সোনালী যুগে ফিরে যাওয়া!
ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

নিখুঁত ছবির যুগে পুরোনো ছবির অপূর্ণতা

এখানেই হয়তো লুকিয়ে আছে পুরো ট্রেন্ডের সবচেয়ে বড় রহস্য। আজকের ছবি অনেক বেশি নিখুঁত। আলো ঠিক করা যায়। রং বদলে দেওয়া যায়। মুখের খুঁত সরিয়ে দেওয়া যায়। কয়েক সেকেন্ডেই তৈরি করা যায় ঝকঝকে, নিখুঁত একটি ছবি। কিন্তু আশির দশকের ছবি ছিল অন্যরকম। ফিকে রং। ফিল্ম গ্রেইন। আলোর স্বাভাবিক ওঠানামা। আর ছিল অসম্পূর্ণতা।

জনপ্রিয় অভিনেতা তৌসিফ মাহবুব লিখেছেন, আশির দশকের কোনো এক বিকেল থেকে…।
ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

আজকের অতিরিক্ত পালিশ করা ডিজিটাল দুনিয়ায় সেই অসম্পূর্ণতাই যেন নতুন সৌন্দর্য হয়ে উঠেছে। যে জিনিসগুলো একসময় পুরোনো প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ছিল, এখন সেগুলোই হয়ে উঠছে নান্দনিকতা।

এখন অতীতে যেতে লাগে শুধু একটি ছবি

একসময় আশির দশকের লুক তৈরি করতে প্রয়োজন হতো ভিনটেজ পোশাক, পুরোনো ক্যামেরা, মেকআপ আর্টিস্ট, হেয়ার স্টাইলিস্ট—আর অনেক প্রস্তুতি। এখন? একটি ছবি আর একটি এআই প্রম্পটই যথেষ্ট। মুহূর্তেই বদলে যাচ্ছে চুল, পোশাক, ব্যাকগ্রাউন্ড, গাড়ি কিংবা ছবির রং। চাইলে ছবিতে যোগ হচ্ছে পুরোনো ফিল্ম ক্যামেরার গ্রেইনও। ফলে এই ট্রেন্ড শুধু ফ্যাশনের নয়—এটি নিজের পরিচয়কে অন্য এক সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার এক ধরনের ডিজিটাল খেলা।

সাফা কবির লিখেছেন, আশির দশকের এই উন্মাদনা এখন পুরো ইন্টারনেট জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আর চরকি তে দারুণ এক চমৎকার ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে!
আশির দশকের এই লুকে ডা. ইরিনকে কেমন লাগছে?
ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

হয়তো মানুষ প্রযুক্তি নয়, একটু অতীতই খুঁজছে

প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, মানুষের জীবন তত বেশি দ্রুত, তত বেশি ডিজিটাল। সবকিছু হাতের মুঠোয়। কিন্তু এই অতিরিক্ত গতির মাঝেই হয়তো তৈরি হচ্ছে থেমে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। আর সেই থেমে যাওয়ার জায়গাটাই যেন খুঁজে নিচ্ছে আশির দশকে।

যে দশক আজকের প্রজন্মের কাছে বাস্তব স্মৃতি নয়, বরং সিনেমা, গান, পুরোনো ছবি আর গল্পের তৈরি এক কল্পিত পৃথিবী। তাই হয়তো ২০২৬ সালের একজন তরুণ এআইয়ের সাহায্যে নিজের ছবিকে আশির দশকে নিয়ে গিয়ে দেখতে চাইছেন— ‘আমি যদি সেই সময়ে জন্মাতাম, তাহলে আমাকে কেমন দেখাত?’ একটি ছবি। একটি প্রম্পট। আর কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে চার দশক পেরিয়ে যাওয়া।

এ যেন প্রযুক্তির সাহায্যে শুধু অতীতকে পুনর্নির্মাণ নয়—
নিজের কল্পনায় হারিয়ে যাওয়া একটি সময়কে একবার ছুঁয়ে দেখা। সময়ের ঘড়ি সামনে এগিয়ে যায়। ফ্যাশন বদলায়। প্রযুক্তি বদলায়। কিন্তু কিছু দশক কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। তারা ফিরে আসে—কখনো পোশাকে, কখনো গানে, কখনো সিনেমায়, আর এবার—এআইয়ের বানানো একটি ছবিতে।

সূত্র: বাংলাপিডিয়া, দ্য ডেইলি স্টার, পিওর এলিগ্যান্স ও কসমোপলিটান ইন্ডিয়া

কালের আলো/জেএন

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন