ইউনিয়নের দোকানেও ভ্যাট: বদলাচ্ছে রাজস্বের মানচিত্র

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ

একটি মুদিদোকান, ছোট কাপড়ের দোকান কিংবা বাজারের একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা—রাজস্বের হিসাবে হয়তো আলাদা করে বড় কিছু নয়। কিন্তু এমন লাখ লাখ দোকানের সম্মিলিত লেনদেনই দেশের প্রান্তিক অর্থনীতির বড় শক্তি। এত দিন সেই অর্থনীতির বড় অংশ ভ্যাট কাঠামোর বাইরে থাকলেও এবার সেখানে পৌঁছাতে চাইছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

  • মাসে ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা নির্ধারিত ভ্যাটের পরিকল্পনা
  • মোবাইল ব্যাংকিংয়ে পরিশোধের সুযোগ
  • প্রথম ধাপে আওতায় আসতে পারে ৩ থেকে ৫ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসা

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ইউনিয়ন পর্যায়ের দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাসে ৫০০ টাকা, উপজেলা পর্যায়ে ১ হাজার টাকা এবং জেলা সদর ও জেলা পৌর এলাকায় ২ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত ভ্যাট দিতে হতে পারে। তবে কারা এই ব্যবস্থার আওতায় আসবেন, তা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।

আওতা বাড়বে রাজস্ব ব্যবস্থার
বর্তমান নিয়মে বার্ষিক বিক্রি বা লেনদেন ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। সাধারণত নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রযোজ্য হয়। কিন্তু এর নিচে থাকা ব্যবসাগুলো বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের বাইরে থাকায় দেশের বিস্তৃত ক্ষুদ্র ব্যবসা খাত ভ্যাট ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এখানেই নতুন উদ্যোগের তাৎপর্য। লেনদেনের পরিমাণ ধরে পৃথক হিসাব করার বদলে নির্ধারিত অঙ্কের ভ্যাট আরোপ করা হলে ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য নিয়মটি সহজ হবে। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থার আওতাও বাড়বে।

এক দশক আগের প্যাকেজ ভ্যাটের মিল
নতুন পরিকল্পনার সঙ্গে এক দশক আগের প্যাকেজ ভ্যাটের কিছুটা মিল থাকলেও বাস্তবায়ন পদ্ধতিতে থাকছে আধুনিকতার ছোঁয়া। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ভ্যাট পরিশোধ করতে পারবেন। ভবিষ্যতে এ জন্য আলাদা অ্যাপ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। ফলে ভ্যাট দিতে ব্যবসায়ীকে বারবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে। ডিজিটাল পরিশোধব্যবস্থা কার্যকর হলে আদায় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে হয়রানির সুযোগও কমানো সম্ভব হবে।

মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহে জোর
পরিকল্পনাটি শুধু কাগজে-কলমে নয়, মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের মধ্য দিয়েই এগোচ্ছে এনবিআর। বিভিন্ন উপজেলা ও বাজারের দোকানের সংখ্যা, ব্যবসার ধরন, অবস্থানসহ নানা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ঠাকুরগাঁও সদরের নুর নাহার প্লাজায় ৫২টি দোকান, রংপুর সিটির বেতপট্টি বাজারে ১২১টি এবং কুড়িগ্রামের রৌমারী বাজারে ৫০টি দোকানের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাজারের চিত্র তুলে এনে কোন এলাকায় কী ধরনের ব্যবসা রয়েছে, তার একটি বাস্তবভিত্তিক তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।

রাজস্বের পরিধি বাড়ানোর নতুন সুযোগ
এনবিআরের প্রাথমিক পরিকল্পনায় ৩ থেকে ৫ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত ভ্যাটের আওতায় আনার কথা রয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভ্যাট থেকে ২ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যের প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ রাজস্বের পরিধি বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি করছে। তবে উদ্যোগটির গুরুত্ব শুধু রাজস্ব আদায়ের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় এলে ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হবে।

ব্যবসার তথ্য, লেনদেন ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক হিসাব সংরক্ষণের সুযোগ বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকিং ও অন্যান্য আর্থিক সেবায় প্রবেশের পথও সহজ হতে পারে। এক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ভ্যাট পরিশোধের পরিকল্পনাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হতে পারে পরিশোধ প্রক্রিয়ার জটিলতা। প্রযুক্তিনির্ভর সহজ ব্যবস্থা সেই বাধা অনেকটাই দূর করতে পারে। ভবিষ্যতে আলাদা অ্যাপ চালু হলে ইউনিয়ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরাও সরাসরি ডিজিটাল ব্যবস্থায় ভ্যাট দিতে পারবেন।

কালের আলো/এম/এএএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন