যে বয়সে বই হাতে স্কুলে যাওয়ার কথা, সমবয়সীদের সঙ্গে মাঠে ছুটে বেড়ানোর কথা—সেই বয়সে হুইলচেয়ারই ৯ বছরের তাসফিয়ার নিত্যসঙ্গী। দারিদ্র্যের কারণে প্রয়োজনীয় ও উন্নত চিকিৎসা না পাওয়ায় হুইলচেয়ারেই যেন থমকে গেছে তার শৈশব। তবে এখনও তার চোখে স্বপ্ন—একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াবে, হাঁটবে, দৌড়াবে এবং অন্য শিশুদের মতো স্কুলে যাবে।
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার চর টেংলাই গ্রামের অটোভ্যানচালক তৈয়ব আলী ও নাসিমা বেগমের মেয়ে তাসফিয়া। দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর শারীরিক সমস্যায় ভুগছে সে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করতে না পারায় দিন দিন আরও অসহায় হয়ে পড়ছে শিশুটি।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, জন্মের প্রায় দুই বছর পর অসুস্থ হয়ে পড়ে তাসফিয়া। প্রথমে সিরাজগঞ্জে চিকিৎসা করানো হয়। পরে চিকিৎসকরা জানান, তার মাথার ভেতরে পানি জমেছে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু অটোভ্যান চালিয়ে কোনো রকমে সংসার চালানো বাবা তৈয়ব আলীর পক্ষে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে ব্যয়বহুল চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি।
তাসফিয়ার মা নাসিমা বেগম বলেন, দেড় বছর বয়সে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর মেয়েকে হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। তখন চিকিৎসকরা মাথার ভেতরে পানি জমার কথা জানান। ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করানোর পরামর্শ দেওয়া হলেও অর্থের অভাবে তা সম্ভব হয়নি। পরে স্থানীয়ভাবে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করানো হলেও কোনো উন্নতি হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে তাসফিয়ার মাথা বড় হচ্ছে এবং হাত-পা ধীরে ধীরে বিকল হয়ে যাচ্ছে।
বাবা তৈয়ব আলী বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। অটোভ্যান চালিয়ে যা আয় করি, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে। মেয়েটাকে সুস্থ করে তুলতে চাই। ও যেন অন্য বাচ্চাদের মতো হাঁটতে পারে, খেলতে পারে, স্কুলে যেতে পারে—এটাই আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। কিন্তু টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না।’
প্রতিবেশীরা জানান, তাসফিয়ার চিকিৎসার জন্য পরিবারটি নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু সামান্য আয়ে সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে উন্নত চিকিৎসার খরচ বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
কামারখন্দ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মোতালিব জানান, তাসফিয়ার জন্য প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য আরও অর্থের প্রয়োজন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হবে, যাতে শিশুটির চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়।
মাত্র ৯ বছর বয়সী তাসফিয়ার চাওয়া খুব বেশি নয়। সে শুধু নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়, মাঠে দৌড়াতে চায়, বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে চায়। সবচেয়ে বড় কথা, একদিন বই হাতে হেঁটে স্কুলে যেতে চায়।
অসহায় এই শিশুটির চিকিৎসায় সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষ এবং ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে তার জীবনে ফিরতে পারে নতুন আশার আলো। হুইলচেয়ারে আটকে থাকা তাসফিয়ার শৈশব হয়তো আবারও ফিরে পেতে পারে স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

কামারখন্দ(সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১১:১২ পূর্বাহ্ণ