রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক মানুষের খণ্ড-বিখণ্ড মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। কখনো ড্রাম, কখনো ব্যাগ, আবার কখনো রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পাওয়া যাচ্ছে মরদেহের বিভিন্ন অংশ। এসব ঘটনার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হত্যার পর পরিচয় গোপন কিংবা মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করার তথ্য উঠে এসেছে তদন্তে।
সর্বশেষ শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) আদাবরের ১০ নম্বর হাক্কারপাড় এলাকায় ময়লাযুক্ত একটি খাল থেকে ব্যাগের ভেতর এক নারীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এখন পর্যন্ত মরদেহের মাথা, দুই হাত ও শরীরের অংশ পাওয়া গেছে। তবে দুই পা এখনো উদ্ধার হয়নি। নিহতের পরিচয় ও হত্যার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
এর আগে চলতি বছরের ৬ আগস্ট সবুজবাগের মাদারটেক এলাকায় একটি কালভার্টের নিচ থেকে মাথা ও দুই হাতসহ এক তরুণীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা নিহতকে ১৯ বছর বয়সী সুরাইয়া আক্তার ওরফে ফালানী হিসেবে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা পরস্পরের পরিচিত এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
গত ১৭ মে মুগদার মান্ডা এলাকায় একটি ভবনের বেজমেন্ট থেকে পলিথিনে মোড়ানো মাথাবিহীন এক পুরুষের সাত টুকরা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে অন্য স্থান থেকে তার মাথাও উদ্ধার করা হয়। নিহতের পরিচয় সৌদি প্রবাসী মোকাররম হোসেন হিসেবে শনাক্ত হয়। তদন্তে অর্থ আত্মসাৎ ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় সামনে আসে।
এর আগে ২৭ ও ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে ওবায়দুল্লাহ নামে এক ব্যক্তির মরদেহের খণ্ডিত অংশ উদ্ধার করা হয়। কাকরাইলে একটি পা, জাতীয় স্টেডিয়ামের কাছে দুটি হাত এবং কমলাপুরে আরেকটি পা পাওয়া যায়। পরে অন্যান্য স্থান থেকে মরদেহের আরও অংশ উদ্ধার করা হয়। তদন্তে জানা যায়, ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে তাকে হত্যার পর পরিচয় ও হত্যার আলামত গোপন করতে মরদেহ সাত টুকরা করা হয়েছিল।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর হাইকোর্ট-সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ মাঠের গেটের কাছে দুটি নীল ড্রাম থেকে রংপুরের ব্যবসায়ী আশরাফুল হকের খণ্ড-বিখণ্ড মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার হাত, পা, মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ কালো পলিথিনে মোড়ানো ছিল। তদন্তে মরদেহ ২৬ টুকরা করার তথ্য পাওয়া যায়। এ ঘটনায় ত্রিভুজ প্রেমসহ একাধিক বিষয় তদন্তে উঠে আসে।
২০২৫ সালের ১৯ মে পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। পরে তার মাথা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় মামলার বিচার শেষে প্রধান আসামি ও তার স্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
রাজধানীতে একের পর এক এ ধরনের ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েই প্রশ্ন তুলছে না, বরং মানুষের মধ্যে মানবিকতা, মায়া-মমতা ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অপরাধ দমনে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত তদন্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিসরে নৈতিকতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধ চর্চা বাড়ানো জরুরি।
আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর জানান, ব্যাগের ভেতর থেকে নারীর মস্তক, দুই হাত ও শরীরের অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। দুই পা এখনো পাওয়া যায়নি। মরদেহের বাকি অংশের সন্ধান এবং নিহতের পরিচয় শনাক্তে পুলিশ কাজ করছে।
কালের আলো/এমএসআইপি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১২:৩৫ অপরাহ্ণ