বিদেশে গিয়ে পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করার আশায় প্রতি বছর বিপজ্জনক সমুদ্রপথে পাড়ি জমাচ্ছেন বাংলাদেশি তরুণদের একটি অংশ। ইউরোপে পৌঁছানোর আশ্বাসে দালালদের হাতে লাখ লাখ টাকা তুলে দিয়ে শুরু হয় এই যাত্রা। অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌযান, খাদ্য ও পানির সংকট, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং পাচারকারীদের নির্যাতনের কারণে পথেই অনেকে মারা যাচ্ছেন। অনেকে নিখোঁজ থাকছেন বছরের পর বছর। যারা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন, তাদের একটি অংশও পাচারকারীদের হাতে জিম্মি হয়ে মুক্তিপণের শিকার হচ্ছেন।সাগরপথে অবৈধভাবে ইউরোপ বা মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সময় প্রতিবছর কত বাংলাদেশি মারা যাচ্ছেন, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব নেই।
বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরেই এ ধরনের ঘটনায় বাংলাদেশিদের মৃত্যু অর্ধ সহস্রাধিক হতে পারে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, উদ্ধার না হওয়া মরদেহ এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সমুদ্রপথে বাড়ছে প্রাণহানি
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ‘মিসিং মাইগ্রেন্টস প্রজেক্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর ও পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন রুট দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার সময় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক অভিবাসী মারা যান বা নিখোঁজ হন। এসব রুটে বাংলাদেশিরাও উল্লেখযোগ্যসংখ্যায় রয়েছেন। আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এসব সমুদ্রপথে ৫৯৮ জন মারা যান। ২০২৫ সালে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়ায় ৮৬০ জনে। এক বছরের ব্যবধানে মৃত্যু ও নিখোঁজের সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
আইওএমের হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় বের হন। তাদের মধ্যে ৮৯০ জনের বেশি মারা যান। এসব তথ্য পুরোপুরি বাংলাদেশিদের মৃত্যুর হিসাব নয়; তবে বাংলাদেশ ও আশপাশের অঞ্চল থেকে অনিয়মিত সমুদ্রপথে যাত্রার ঝুঁকির মাত্রা এতে স্পষ্ট হয়।
চলতি বছরের এপ্রিলেও আন্দামান সাগরে একটি নৌকাডুবির ঘটনায় রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশি নাগরিকসহ প্রায় ২৫০ জন নিখোঁজ হন। ১৪ এপ্রিল প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) এ তথ্য জানায়।
স্বপ্ন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে দালাল
বিদেশে যাওয়ার আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় রয়েছে মানব পাচারকারী ও অভিবাসী চোরাচালান চক্র। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের তরুণদের একটি অংশ এসব ঝুঁকিপূর্ণ রুটে যাওয়ার ক্ষেত্রে বেশি যুক্ত হচ্ছে। দালালরা অনেক সময় বৈধ চাকরি, ভিসা কিংবা নিরাপদ বিদেশযাত্রার কথা বলে পরিবারের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নেয়। পরে যাত্রাপথ পরিবর্তন করে অবৈধ রুটে পাঠানো হয়। সমুদ্রযাত্রায় নৌযানে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ তোলা, পর্যাপ্ত খাবার ও পানির ব্যবস্থা না থাকা এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস উপেক্ষা করার মতো কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।
শুধু দুর্ঘটনাই নয়, পথিমধ্যে পাচারকারীদের হাতে অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। বিদেশে পৌঁছানোর পরও অনেককে আটকে রেখে দেশে থাকা পরিবারের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। অর্থ না দিলে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।
মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে
মানব পাচার প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে দালাল ও পাচারকারীদের গ্রেপ্তার করছে। তবে এসব অভিযানের পরও পুরো চক্রের কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না। কারণ, মাঠপর্যায়ের দালালদের একটি অংশ গ্রেপ্তার হলেও অর্থদাতা, নিয়ন্ত্রক ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রক্ষাকারীদের বড় একটি অংশ শনাক্ত বা গ্রেপ্তারের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, মানব পাচারের মামলায় সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মামলার দীর্ঘসূত্রতা, বাদী ও সাক্ষীদের ভয়ভীতি এবং অনেক ক্ষেত্রে আদালতের বাইরে আপস-মীমাংসার প্রবণতা। ফলে মামলা হলেও সব ক্ষেত্রে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এতে পাচারকারী চক্রের ওপর কার্যকর চাপ তৈরি হচ্ছে না। একজন দালাল গ্রেপ্তার হলেও তার জায়গায় অন্য ব্যক্তি যুক্ত হয়ে একই রুটে নতুন করে লোক পাঠানোর সুযোগ পাচ্ছে।
ফিরে আসাদের বয়ানে ভয়াবহতা
ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতায় উঠে আসে পাচারচক্রের কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক। তাদের কেউ দিনের পর দিন সমুদ্রে খাবার ও পানির সংকটে ছিলেন, কেউ অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌযানে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে ভেসেছেন। আবার কারও ক্ষেত্রে ছিল পাচারকারীদের মারধর ও জিম্মি করে রাখার ঘটনা।
ফিরে আসা ব্যক্তিদের অনেকের পরিবার বিদেশ যাওয়ার জন্য জমি, বসতভিটা বা অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করেছে। যাত্রা ব্যর্থ হলে সেই পরিবারগুলোকে ঋণের বোঝা বহন করতে হয়। আর কেউ নিখোঁজ হলে পরিবারকে একই সঙ্গে আর্থিক ক্ষতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়।
বৈধ পথের বিকল্প তৈরি জরুরি
সিআইডি বিদেশে কর্মসংস্থান, অভিবাসন ও ভ্রমণের ক্ষেত্রে সরকার অনুমোদিত বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণের জন্য জনগণকে পরামর্শ দিয়েছে। মানব পাচার, জাল ভিসা, অভিবাসী চোরাচালান বা এ ধরনের অপরাধের তথ্য জানা থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে সিআইডিকে জানানোর আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সচেতনতামূলক প্রচার চালিয়ে এই প্রবণতা ঠেকানো সম্ভব নয়। বিদেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার পেছনে থাকা কর্মসংস্থানের সংকট, দারিদ্র্য, দ্রুত আয় করার প্রত্যাশা এবং দালালদের প্রতারণার বিরুদ্ধে একযোগে ব্যবস্থা নিতে হবে। বৈধ অভিবাসনের সুযোগ ও তথ্য সহজলভ্য করার পাশাপাশি প্রতিটি পর্যায়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পাচারচক্রের নিচের স্তরের সদস্যদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অর্থের উৎস, যোগাযোগব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা। কারণ, সমুদ্রপথে একজন তরুণের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে সংগঠিত একটি অপরাধচক্র। সেই চক্রের মূল হোতাদের বিচারের আওতায় না আনা গেলে ঝুঁকিপূর্ণ সাগরযাত্রা এবং মৃত্যুর এই ধারাবাহিকতা থামানো কঠিন।
কালের আলো/এম/এএইচ

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৬:২২ অপরাহ্ণ