দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার পরও কৃষকের কাছে তা নির্বিঘ্নে পৌঁছানো নিয়ে যেন কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি না হয়-এবার সেই ব্যবস্থাপনাকেই সামনে আনল সরকার। তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেছেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই। কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার মজুত রয়েছে। তবে মজুত থাকলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে না, সঠিক সময়ে সঠিক কৃষকের হাতে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করতে বিতরণ ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি জরুরি।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জামালপুর জেলার মাসিক আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ ইউসুফ আলী সভায় সভাপতিত্ব করেন।
গুরুত্ব পেয়েছে বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা
জামালপুরে মাসিক আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সভায় দেওয়া প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে সারের সরবরাহের পাশাপাশি বিতরণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সম্ভাবনাও গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর নির্দেশনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিষয়-সরকারি মজুত ও মাঠপর্যায়ের সরবরাহের মধ্যে যেন কোনো ব্যবধান তৈরি না হয়।
কৃষি মৌসুমে সারের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। এ সময় পরিবহন, ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ, বাজার ব্যবস্থাপনা কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে বণ্টনের কোনো ধাপে সমস্যা দেখা দিলে সামগ্রিকভাবে সংকটের ধারণা তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রকৃত ঘাটতির চেয়ে গুজব, মজুতদারি বা অনিয়মও কৃষকের উদ্বেগ বাড়াতে পারে। তাই নিয়মিত মনিটরিংকে কেবল প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে না দেখে সরবরাহ ব্যবস্থার সুরক্ষা হিসেবে দেখার বার্তা দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
কৃত্রিম সংকট ঠেকানোই বড় পরীক্ষা
প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, সারের বিতরণ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা যাবে না। এই নির্দেশনার গুরুত্ব রয়েছে বাজার ব্যবস্থাপনার দিক থেকেও। কারণ প্রকৃত ঘাটতি না থাকলেও কোনো পর্যায়ে সার আটকে রাখা, অতিরিক্ত দাম নেওয়া কিংবা সরবরাহ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলে স্থানীয় বাজারে সংকটের আবহ সৃষ্টি হতে পারে। এর প্রভাব শুধু কৃষকের তাৎক্ষণিক ভোগান্তিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। অতিরিক্ত দামে সার কিনতে হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, কমে যায় কৃষকের সম্ভাব্য আয়।
আবার প্রয়োজনের সময়ে সার না পেলে ফসলের উৎপাদনশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধকে কৃষি উৎপাদনের স্বার্থেই দেখতে হবে। এখানেই মাঠ প্রশাসনের নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সরবরাহের প্রতিটি ধাপ নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকলে কোথায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। একই সঙ্গে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও তৈরি হবে। ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, ‘সরকার কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখা ও কৃষকের স্বার্থে পর্যাপ্ত সার মজুত রেখেছে। ফলে সারের সংকট নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।’
সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা
সভায় জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় জনবল ও যানবাহন সরবরাহ করা হবে। মাঠপর্যায়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত টহল, দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত জনবল ও যানবাহনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়াতে এসব সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার হলে অপরাধ প্রতিরোধের কার্যক্রমও গতিশীল হবে।

মাদক নিয়ন্ত্রণে তৃণমূলকে সম্পৃক্ত করার নির্দেশ
মাদককে সমাজে অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যেকোনো উন্নয়নের ক্ষেত্রে মাদক একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করতে প্রয়োজনে তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন তিনি। তাঁর মতে, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে কাজ করলে সমাজ থেকে মাদকের বিস্তার ঠেকানো সহজ হবে।
এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ মাদক নিয়ন্ত্রণ শুধু অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর করা কঠিন। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা, সামাজিক প্রতিরোধ এবং প্রশাসনের সঙ্গে জনগণের নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও কার্যকর হতে পারে।
সভায় সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শাহ মো. ওয়ারেস আলী মামুন, এ.ই. সুলতান মাহমুদ বাবু, মো. ফরিদুল কবির তালুকদার শামীম, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, জামালপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল হক, পুলিশ সুপার মোছা. ফারহানা ইয়াসমিন এবং ৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বক্তব্য রাখেন।
কালের আলো/এমএএএমকে

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৬:১৭ অপরাহ্ণ