ইসলামী শরিয়তে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তরের পদ্ধতি

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৪:৪৬ অপরাহ্ণ

ইসলামী শরিয়তে সম্পত্তির মালিকানা অর্জনের পাশাপাশি তা অন্যের কাছে হস্তান্তরেরও নির্দিষ্ট কিছু বিধান রয়েছে। জীবিত অবস্থায় এবং মৃত্যুর পর—দুই পর্যায়েই বিভিন্ন বৈধ পদ্ধতিতে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করা যায়।

ফিকহের গ্রন্থগুলোতে মালিকানা হস্তান্তরকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে—জীবিত অবস্থায় মালিকানা হস্তান্তর এবং মৃত্যুর পর মালিকানা হস্তান্তর।

জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি হস্তান্তরের প্রধান পদ্ধতিগুলো হলো বিক্রয়, হেবা বা দান, সদকা, ওয়াকফ, মুআওয়াজা ও সুলাহ। অন্যদিকে মৃত্যুর পর সম্পত্তি হস্তান্তরের প্রধান দুটি মাধ্যম হলো অসিয়ত ও উত্তরাধিকার।

বিক্রয়

মূল্য বা অন্য কোনো বিনিময়ের মাধ্যমে কোনো সম্পত্তির মালিকানা অন্যের কাছে হস্তান্তর করাকে বিক্রয় বলা হয়। ইসলামী শরিয়তে বৈধ শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বেচাকেনা বৈধ।

বিক্রয় চুক্তির ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের সম্মতি থাকা, চুক্তি করার আইনগত যোগ্যতা থাকা, পণ্য বৈধ হওয়া, বিক্রেতার পণ্যটির মালিকানা বা বিক্রয়ের অনুমতি থাকা এবং পণ্য ও মূল্য সম্পর্কে উভয় পক্ষের সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকা জরুরি। পাশাপাশি পণ্য হস্তান্তরযোগ্য হতে হবে।

হেবা বা দান

কোনো বিনিময় ছাড়া জীবিত অবস্থায় কাউকে সম্পত্তির মালিক করে দেওয়াকে হেবা বলা হয়।

হেবা সম্পন্ন হওয়ার জন্য দাতার প্রস্তাব ও গ্রহীতার গ্রহণ থাকা এবং দাতার সম্পত্তির ওপর বৈধ মালিকানা থাকা প্রয়োজন। দাতা আর্থিক লেনদেনের উপযুক্ত হওয়া এবং দান করা সম্পত্তির অস্তিত্ব ও আর্থিক মূল্য থাকা জরুরি।

এ ছাড়া সম্পত্তিটি ব্যক্তিমালিকানাধীন ও নির্দিষ্ট হতে হবে। বিশেষ করে হেবা সম্পন্ন হওয়ার জন্য দানকৃত সম্পত্তি গ্রহীতার দখল ও নিয়ন্ত্রণে আসা গুরুত্বপূর্ণ।

সদকা

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে সম্পত্তি বা অর্থ দান করাকে সদকা বলা হয়। হেবা ও সদকা উভয়ই দানের অন্তর্ভুক্ত হলেও উদ্দেশ্য ও বিধানের ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে।

সদকার মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সওয়াব অর্জন। সাধারণত দরিদ্র ও অসহায়দের সদকা দেওয়া হয়। অন্যদিকে হেবা ধনী-গরিব নির্বিশেষে যে কাউকে দেওয়া যেতে পারে।

জাকাত ও সদকাতুল ফিতরের মতো কিছু সদকা শরিয়তে আবশ্যক। সদকার ক্ষেত্রে নিয়ত শুদ্ধ হওয়া এবং সম্পদ বৈধ উপায়ে অর্জিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ফরজ বা ওয়াজিব সদকার ক্ষেত্রে শরিয়ত নির্ধারিত হকদারদের কাছে তা পৌঁছাতে হয়।

ওয়াকফ

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো সম্পত্তির মূল মালিকানা ত্যাগ করে সেটির উপকার মানুষের জন্য নির্ধারণ করাকে ওয়াকফ বলা হয়।

ওয়াকফকারীকে সম্পত্তিটির বৈধ ও পূর্ণ মালিক হতে হবে এবং তিনি আর্থিক লেনদেনের উপযুক্ত হতে হবে। ওয়াকফ করা সম্পত্তি নির্দিষ্ট, মূল্যবান ও বৈধ উপকারে ব্যবহারযোগ্য হওয়া প্রয়োজন।

এ ছাড়া ওয়াকফকৃত সম্পত্তির ওপর অন্য কারও অধিকার থাকা যাবে না এবং সেটি এমন হতে হবে, যার মূল অক্ষুণ্ন রেখে তা থেকে উপকার নেওয়া সম্ভব।

মুআওয়াজা

একটি পণ্য বা সম্পত্তির বিনিময়ে অন্য পণ্য বা সম্পত্তি গ্রহণের মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তরকে মুআওয়াজা বলা হয়। এটি এক ধরনের বিনিময়ভিত্তিক লেনদেন।

মুআওয়াজা মূলত বেচাকেনারই একটি রূপ। তাই বিক্রয় চুক্তি বৈধ হওয়ার যেসব শর্ত রয়েছে, সেগুলো মেনে মুআওয়াজাও সম্পন্ন করতে হয়।

সুলাহ

বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য যে চুক্তি করা হয়, তাকে সুলাহ বলা হয়। এর মাধ্যমেও সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর হতে পারে।

সুলাহকারীকে আর্থিক লেনদেনের উপযুক্ত হতে হবে। চুক্তিতে ব্যবহৃত সম্পত্তি বা বিনিময়ের বস্তু বৈধ ও মূল্যবান হওয়া এবং তার পরিমাণ ও পরিচয় স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

মৃত্যুর পর মালিকানা হস্তান্তর

মৃত্যুর পর ইসলামী শরিয়তে মূলত দুটি উপায়ে সম্পত্তির মালিকানা অন্যের কাছে যায়—অসিয়ত ও উত্তরাধিকার।

অসিয়ত

কোনো ব্যক্তি তাঁর মৃত্যুর পর অন্য কাউকে সম্পত্তি, ঋণ বা কোনো উপকারের মালিক করার নির্দেশ দিয়ে গেলে তাকে অসিয়ত বলা হয়।

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি তাঁর সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ এমন ব্যক্তির জন্য অসিয়ত করতে পারেন, যিনি তাঁর উত্তরাধিকারী নন। অসিয়তকারীর স্বাধীন সম্মতি থাকতে হবে এবং যাঁর জন্য অসিয়ত করা হচ্ছে, তাঁর অস্তিত্ব ও পরিচয় জানা থাকতে হবে।

অসিয়তের সম্পত্তিও শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ ও মূল্যবান হতে হবে। অসিয়তকারীর কোনো বৈধ ওয়ারিশের জন্য অসিয়ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে শরিয়তের বিশেষ বিধান রয়েছে।

উত্তরাধিকার

মৃত ব্যক্তির সঙ্গে রক্ত, বৈবাহিক বা শরিয়তস্বীকৃত আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে তাঁর সম্পত্তিতে অধিকার লাভকে উত্তরাধিকার বলা হয়।

উত্তরাধিকার কার্যকর হওয়ার জন্য প্রথমে সম্পত্তির মালিকের মৃত্যু নিশ্চিত হতে হবে। তাঁর মৃত্যুর সময় উত্তরাধিকারী জীবিত থাকতে হবে এবং মৃত ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি পাওয়ার বৈধ সম্পর্ক থাকতে হবে।

ইসলামী শরিয়তে উত্তরাধিকার বণ্টনের বিস্তারিত বিধান কোরআনে নির্ধারিত হয়েছে। উত্তরাধিকার লাভের ক্ষেত্রে হত্যার মতো কিছু কারণ বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়। ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে পৃথক বিধান রয়েছে।

সব মিলিয়ে ইসলামী শরিয়তে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও সমাজের অধিকার, সম্পদের বৈধতা এবং লেনদেনের স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিক্রয়, দান, সদকা, ওয়াকফ, অসিয়ত ও উত্তরাধিকার—প্রতিটি পদ্ধতিরই আলাদা বিধান ও শর্ত রয়েছে।

সূত্র: তুহফাতুল ফুকাহা, আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ, আল-ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু, আল-মুগনি ও বাদায়িউস সানায়ি

কালের আলো/এসএ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন