গবেষণার ঘাটতিতে বাড়ছে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ

দেশে সংক্রামক ও অসংক্রামক-দুই ধরনের রোগের বিস্তারই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। করোনা মহামারি, ডেঙ্গু এবং সাম্প্রতিক হাম পরিস্থিতি দেখিয়েছে, সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা থাকলেও তা মোকাবিলায় সময়মতো কার্যকর প্রস্তুতি নিতে পারছে না সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অন্যতম কারণ বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও তথ্যকে স্বাস্থ্যনীতির কেন্দ্রে না রাখা।

জানা যায়, কোনো রোগের প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর তৎপর হওয়ার প্রবণতা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের। ফলে রোগ শনাক্তকরণ, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ, জনবল এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় হঠাৎ চাপ তৈরি হয়। পর্যাপ্ত লজিস্টিক সহায়তা ও চিকিৎসা না পেয়ে অনেক রোগীর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুও ঘটে। হামসহ সাম্প্রতিক সংক্রামক রোগের বিস্তার তাই শুধু একটি রোগ নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা নয়। এটি আগাম ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রস্তুতির দুর্বলতাকেও সামনে এনেছে।

অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর চিত্র
গত এক দশকে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, স্নায়ুবিক ও কিডনি রোগ, শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা, উচ্চরক্তচাপ, আর্থ্রাইটিস ও মানসিক অসুস্থতা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব রোগে আক্রান্তদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ৩০ থেকে ৭০ বছর বয়সের মধ্যেই মারা যাচ্ছেন। অর্থাৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি এখন শুধু বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়াতে দেশে শতাধিক মেডিকেল কলেজ, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

গবেষণার অর্থ ও ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ এমনিতেই কম। তিনি বলেন, বাজেট পর্যালোচনার সময় তা আরও কমে যায়। গবেষণার জন্য বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করা সম্ভব হয় না। নিরপেক্ষভাবে অর্থ বণ্টন করলেও অডিট আপত্তির মুখে পড়তে হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব জটিলতায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনৈতিক চাপ সামলাতে হয়। এতে গবেষণা অর্থ ব্যবহারে এক ধরনের অনীহা তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত গবেষণার পরিধিকেই সংকুচিত করে।

প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রয়োজন
বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সায়েবা আক্তারের মতে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণালব্ধ প্রমাণ ছাড়া ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা সম্ভব নয়। এজন্য গবেষণায় দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি দলীয় বা গোষ্ঠীগত প্রভাবের বাইরে গিয়ে যোগ্য প্রতিষ্ঠান ও গবেষকদের কাজ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বাইরের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সমান সুযোগ দিতে হবে। গবেষণার ফল সংরক্ষণ, নীতিনির্ধারণে ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। কারণ রোগের প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর বদলে আগাম তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুতি নেওয়াই পারে স্বাস্থ্যব্যবস্থার চাপ কমাতে।

তাঁরা আরও বলেন, স্বাস্থ্য খাতে টেকসই পরিবর্তনের জন্য অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি গবেষণাভিত্তিক নীতি, স্বচ্ছ অর্থব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি ও আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে বিচ্ছিন্নভাবে একেকটি রোগ মোকাবিলা করেও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটের ঝুঁকি এড়ানো কঠিন হবে।

কালের আলো/এম/এএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন