ইলন মাস্ককে নিয়ে চার ঘণ্টার তথ্যচিত্র, ভেনিসে তুমুল আলোচনা

বিনোদন ডেস্ক:
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১১:২৭ পূর্বাহ্ণ

টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ককে নিয়ে নির্মিত প্রায় চার ঘণ্টার তথ্যচিত্র ‘মাস্ক’ প্রদর্শনের পর ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে। অস্কারজয়ী তথ্যচিত্র নির্মাতা অ্যালেক্স গিবনির পরিচালিত ছবিতে মাস্কের ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিজীবন ও জন-ইমেজকে গভীরভাবে অনুসন্ধান করা হয়েছে।

একুশ শতকের প্রযুক্তি ও ক্ষমতার আলোচনায় ইলন মাস্ক একটি পরিচিত নাম। টেসলা, স্পেসএক্স ও এক্সের মতো প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে। মহাকাশ গবেষণা থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে রাজনীতি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাব নিয়ে যেমন প্রশংসা রয়েছে, তেমনি রয়েছে তীব্র সমালোচনাও।

এই দুই বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই মাস্ককে দেখার চেষ্টা করেছেন গিবনি। ছবিতে ডটকম যুগে মাস্কের উত্থান, জিপ২ ও পেপালে সাফল্য এবং পরবর্তী সময়ে টেসলা ও স্পেসএক্সের মাধ্যমে তাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তোলার গল্প তুলে ধরা হয়েছে।

তবে প্রচলিত জীবনীচিত্রের মতো শুধু সাফল্যের গল্প বলেননি নির্মাতা। বরং তাঁর মূল প্রশ্ন—একজন মানুষের হাতে যখন বিপুল ব্যবসায়িক, প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়, তখন এর পরিণতি কী হতে পারে?

মাস্কের অনুপস্থিতিতেই ‘মাস্ক’

তথ্যচিত্রটির অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো, মাস্ক নিজে এতে কোনো সাক্ষাৎকার দেননি। তাঁর অনুপস্থিতি পূরণ করতে নির্মাতা ব্যবহার করেছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কম্পিউটারনির্মিত একটি ডিজিটাল চরিত্র।

মাস্কের মতো দেখতে ওই চরিত্রের কণ্ঠও তৈরি করা হয়েছে তাঁর পুরোনো সাক্ষাৎকার ও প্রকাশ্য বক্তব্যের ভিত্তিতে। অর্থাৎ নতুন বক্তব্য তৈরি করে তাঁর মুখে বসানো হয়নি; বরং আগে দেওয়া তাঁর বক্তব্যগুলোকে নতুন প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এই কৌশল নিয়ে সমালোচকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ এটিকে সৃজনশীল ও কার্যকর নির্মাণশৈলী হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, জীবিত একজন ব্যক্তির কৃত্রিম অবতার ও কণ্ঠ ব্যবহার কতটা নৈতিক।

উঠে এসেছে ব্যক্তিজীবনও

ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মাস্কের ব্যক্তিজীবনও তথ্যচিত্রটির বড় অংশজুড়ে রয়েছে। তাঁর প্রথম স্ত্রী জাস্টিন মাস্ক তাঁদের সম্পর্ক, সন্তান এবং এক সন্তানের মৃত্যুর অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে মাস্কের প্রকাশ্য বক্তব্যের পার্থক্যও ছবিতে তুলে ধরা হয়েছে।

মাস্কের সাবেক সঙ্গী অ্যাশলি সেন্ট ক্লেয়ারও নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। মাস্কের সন্তান, সম্পর্ক ও পরিবার নিয়ে তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যও তথ্যচিত্রে স্থান পেয়েছে।

রাজনীতিতে মাস্কের প্রভাব

মাস্কের টুইটার কেনা, সেটির নাম পরিবর্তন করে এক্স করা এবং পরবর্তী সময়ে মার্কিন রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছবিটির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা এবং রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়েও অনুসন্ধান করেছেন গিবনি।

নির্মাতার মতে, মাস্ককে নিয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পান। এমনকি তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলেও ভয়ের পরিবেশ ছিল বলে দাবি করেছেন তিনি। এ কারণে তথ্যচিত্রটি তৈরি করতে গিয়ে মাস্কের গল্প ধীরে ধীরে তাঁর কাছে ক্ষমতা ও জবাবদিহির গল্প হয়ে ওঠে।

মাস্কের ক্ষোভ, আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি

ছবিটি ভেনিসে প্রদর্শনের আগেই এর সমালোচনা করেন মাস্ক। তাঁর দাবি, তথ্যচিত্রটি মিথ্যা, একপেশে এবং বিরক্তিকর। তাঁর আইনজীবীরাও নির্মাতা ও পরিবেশকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, ছবিতে মাস্ক সম্পর্কে মিথ্যা ও মানহানিকর তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।

তবে গিবনি তাঁর অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তাঁর দাবি, তথ্যচিত্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো যাচাই করা হয়েছে এবং মুক্তির আগে আইনজীবীরা পুরো ছবিটি পর্যালোচনা করেছেন।

চার ঘণ্টার ছবিতে বড় প্রশ্ন

ভেনিসে প্রদর্শনের পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ছবিটিকে মাস্কের ক্ষমতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কঠোর অনুসন্ধান হিসেবে দেখেছে। তবে প্রায় চার ঘণ্টার দৈর্ঘ্য এবং বিপুল তথ্যের ভার নিয়েও কিছু সমালোচনা রয়েছে। কারও কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী দলিল, আবার কারও কাছে দীর্ঘ এক অভিযোগপত্র।

গিবনির তথ্যচিত্র শেষ পর্যন্ত শুধু ইলন মাস্ক কেমন মানুষ—সেই প্রশ্নে আটকে থাকেনি। বরং বড় প্রশ্ন তুলেছে একজন ব্যক্তির হাতে ব্যবসা, প্রযুক্তি, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক প্রভাবের এতটা ক্ষমতা থাকা উচিত কি না।

মাস্কের সমর্থকেরা তাঁকে ভবিষ্যৎ নির্মাণে সাহসী প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে দেখেন। সমালোচকদের আশঙ্কা, তাঁর মতো ব্যক্তির হাতে এত ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন গণতান্ত্রিক জবাবদিহির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ‘মাস্ক’ তথ্যচিত্রটি মূলত এই দুই বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইলন মাস্ককে নতুন করে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে।

কালের আলো/এসএ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন