স্কুল আছে, শ্রেণিকক্ষ আছে, ক্লাসও হচ্ছে নিয়মিত। শুধু নেই মাঠ। যে বয়সে শিশুদের দৌড়ানোর, খেলাধুলা করার কথা, সেই বয়সেই তাদের বড় একটি অংশ আটকে আছে চার দেয়ালে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাঠ, ক্রীড়া ও শরীরচর্চার ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক হলেও ঢাকাসহ সারা দেশে ১৫ সহস্রাধিক সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই কোনো খেলার মাঠ।
রাজধানীতে পরিস্থিতি আরও প্রকট। ৫ হাজারের বেশি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানের ৯৫ শতাংশের বেশি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত। এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৮ শতাংশেরই নিজস্ব মাঠ নেই। অনেক প্রতিষ্ঠান চলছে ছোট ভবন, গ্যারেজ কিংবা ছাদের ওপর।
সংখ্যায় মাঠহীনতার চিত্র
দেশের মাঠসংকটের ব্যাপ্তি বোঝা যায় কয়েকটি সংখ্যাতেই। ঢাকার ৩৪২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৫২টিতেই নেই খেলার মাঠ। বিভাগীয় শহরগুলোতেও প্রায় ৪০ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাঠ নেই। দেশে থাকা ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থীর পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই। ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৭২ দশমিক ২৬ শতাংশ শিক্ষার্থীও মাঠের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। রাজধানীর সামগ্রিক চিত্র আরও সংকটময়। আইপিডির গবেষণা অনুযায়ী, দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রয়োজন অন্তত ৬১০টি খেলার মাঠ; বাস্তবে আছে মাত্র ২৩৫টি।
নীতিমালা আছে কিন্তু বাস্তবায়ন নেই
২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাঠ, ক্রীড়া, খেলাধুলা ও শরীরচর্চার ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। গত ২৫ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ সংরক্ষণ এবং শিক্ষা কার্যক্রম শেষে ও ছুটির দিনে আশপাশের শিশু-কিশোরদের জন্য তা উন্মুক্ত রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
কিন্তু সরেজমিনে পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা গেছে, মাঠ থাকা সত্ত্বেও বিকেলে স্কুল ছুটির পর কয়েকটির মাঠ তালাবদ্ধ রাখা হয়। মাঠ নেই-এমন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজিরও খুব বেশি দেখা যায় না।
মাঠের জায়গা দখল করছে পর্দা
মাঠ না থাকায় শিক্ষার্থীদের অবসরও বদলে যাচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে গড়ে উঠছে রেস্টুরেন্ট ও ফাস্টফুডের দোকান। কোথাও আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেয়াল ঘেঁষেই বিক্রি হচ্ছে সিগারেট ও তামাকজাত পণ্য, যদিও ১০০ মিটারের মধ্যে এসব পণ্য বিক্রি ও প্রচার নিষিদ্ধ।
মাঠের আরেক বিকল্প হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোন। আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার স্কুলপড়ুয়া শিশুদের বড় একটি অংশ প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ইলেকট্রনিক পর্দায় কাটায়। এতে ঘুমের সমস্যা, ওজন বৃদ্ধি, চোখের সমস্যা ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
ঢাকায় মাঠের ঘাটতি ৩৭৫টি
আইপিডির হিসাবে, আধুনিক শহরে প্রতি আধা বর্গকিলোমিটারে একটি খেলার মাঠ থাকা প্রয়োজন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৩০৫ দশমিক ৪৭ বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রয়োজন অন্তত ৬১০টি মাঠ। আছে ২৩৫টি; ঘাটতি ৩৭৫টি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, জনপ্রতি প্রয়োজন ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা। অথচ ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় জনপ্রতি খোলা জায়গা এক বর্গমিটারেরও কম। পুরান ঢাকার আটটি ওয়ার্ডে একটিও উন্মুক্ত স্থান নেই বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
মাঠ উন্নয়নের পরিকল্পনা
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, দেশের প্রায় ৬৬ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নতুন বেসরকারি বিদ্যালয়ের অনুমোদনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট মানের মাঠ বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে কাজ চলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল হালিম বলেন, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলার সুযোগ ও উন্মুক্ত মাঠ থাকা জরুরি। নীতিমালা ও নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবতা বলছে, হাজার হাজার শিক্ষার্থী এখনও মাঠের বাইরে।
কালের আলো/এম/এএইচ

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশের সময়: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৫:৫২ অপরাহ্ণ