ইয়েমেনের ইরান–সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংসে ব্যবহৃত প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসায় পরিস্থিতি সামাল দিতে আঞ্চলিক ও পশ্চিমা মিত্রদের কাছে জরুরি সামরিক সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা বুধবার এ তথ্য জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছে। হুতি ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা ঠেকাতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে সৌদি সরকার।
সৌদি আরবের প্রধান মিত্র ও অস্ত্র সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদেরও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুত কমছে। ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের কারণে এসব অস্ত্রের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে শুধু ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর না করে অন্য দেশগুলোর কাছেও সহায়তা চাইছে রিয়াদ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই দুই কর্মকর্তা জানান, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না থাকায় তাঁরা পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। সৌদি কর্মকর্তাদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সৌদির অভিযোগ, হুতিদের অস্বীকার
ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে নতুন করে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়েছে। এটি এখন বৃহত্তর ইরান সংঘাতের একটি নতুন ফ্রন্ট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সৌদি আরব গতকাল অভিযোগ করেছে, হুতিরা পবিত্র নগরী মক্কার দিকে ড্রোন ছুড়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, ড্রোনটি ভূপাতিত করা হয়েছে। মক্কায় পবিত্র কাবা অবস্থিত এবং প্রতিবছর হজ পালনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো মুসল্লি সেখানে সমবেত হন।
সৌদি আরব সতর্ক করে বলেছে, পবিত্র নগরীর দিকে এ ধরনের হামলার চেষ্টা ‘চূড়ান্ত সীমা’ লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে ইয়েমেনের সীমান্ত থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ কিলোমিটার দূরের মক্কার দিকে ড্রোন পাঠানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে হুতিরা।
এরই মধ্যে হুতিরা দাবি করেছে, ইয়েমেনের আকাশে সৌদি আরবের একটি এফ–১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে তারা। এ দাবির সমর্থনে যুদ্ধবিমানটির ধ্বংসাবশেষের ছবিও প্রকাশ করেছে গোষ্ঠীটি।
জ্বালানি রপ্তানি নিয়েও উদ্বেগ
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশ। ফলে দেশটির সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি তেলক্ষেত্র, পাইপলাইন ও অন্যান্য জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তাও বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি সৌদি আরবে হামলার পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট–ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে গেছে। এর পেছনে ইরাকের ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হচ্ছে। পাইপলাইনটি কয়েক সপ্তাহ বন্ধ থাকতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া হুতিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা এবং লোহিত সাগরে দেশটির জাহাজে হামলা চালাচ্ছে।
লোহিত সাগরের বাব আল–মানদেব প্রণালির কয়েকটি দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবিও করেছে হুতিরা। প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে তারা।
ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন কার্যত বন্ধ থাকায় সৌদি আরবের জন্য বাব আল–মানদেব ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ। কিন্তু সেখানে হুতিদের তৎপরতা নতুন করে রপ্তানি–সংকট তৈরি করেছে।
এর প্রভাব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়ছে। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আঞ্চলিক এক কর্মকর্তা বলেন, সৌদি আরব এখন কঠিন পরিস্থিতির মুখে রয়েছে। কারণ শুধু সামরিক ঘাঁটি ও সরকারি স্থাপনা নয়, দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তেল অবকাঠামোকেও একই সঙ্গে সুরক্ষা দিতে হচ্ছে।
মিত্রদের পাশে চায় রিয়াদ
হুতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মিত্রদের একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছে সৌদি আরব। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওমান ও মিসর কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় রয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নিউ আমেরিকার ফেলো অ্যাডাম ব্যারনের মতে, বিষয়টি শুধু সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যকার সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো কীভাবে নিরাপদ রাখা যায়, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহান্তে ওমানের রাজধানী মাসকাটে হুতি প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। সেখানে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে বৈঠকের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
সামরিক সহায়তার বদলে কূটনীতিতে জোর
সৌদি আরব পশ্চিমা ও আঞ্চলিক মিত্রদের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা চাইলেও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো সামরিক হস্তক্ষেপের পরিবর্তে কূটনৈতিক সহায়তার দিকে বেশি জোর দিচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র টম ওয়েলস বলেছেন, সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব রয়েছে। তবে সৌদি আরব সামরিক সহায়তা চেয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেননি।
এদিকে ইউরোপ ও ন্যাটোর কর্মকর্তারাও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার সংকটের কথা স্বীকার করেছেন। ফলে সৌদি আরবকে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করার সক্ষমতা ইউরোপের কতটা রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও নতুন পরিস্থিতিতে আলোচনায় এসেছে। তবে দেশ দুটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হুতিদের মোকাবিলায় সৌদি আরব সরাসরি তাদের কাছে সামরিক সহায়তা চায়নি।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ মক্কায় হামলার অভিযোগের পর সৌদি আরবের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছেন।
সৌদি–হুতি সংঘাতে সরাসরি জড়াতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী। দেশটির কাছে বিপুল পরিমাণ মার্কিন অস্ত্র রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে, ওয়াশিংটন সৌদি–হুতি সংঘাতে সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সম্প্রতি বলেছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে ওয়াশিংটনের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে হুতিদের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আলোচনা করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, সৌদি বাহিনীকে গোয়েন্দা তথ্য আদান–প্রদান ও সামরিক পরিকল্পনায় সহায়তা বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে।
গত সপ্তাহে জার্মানিতে আটটি দেশের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বৈঠকও করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়েছে বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
চীন সফরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি চীন সফর করছেন। ইরানের সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল ক্রেতা চীন চলমান সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দ্রুত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইয়েমেন ও লোহিত সাগরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ওয়াং ই।
অন্যদিকে আরাগচি বলেছেন, তেহরান এ অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে চায় এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।
সূত্রঃ রয়টার্স
কালের আলো/এসএ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৮:০৭ অপরাহ্ণ