৭ হাজার টাকার চাকরি থেকে ৯০০ কর্মীর প্রতিষ্ঠানের সিইও

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৯:১৬ অপরাহ্ণ

রংপুরের গঙ্গাচড়ার গান্নারপাড় গ্রামের এক সাধারণ শিক্ষক পরিবারের ছেলে মুসনাদ ই আহমেদ। একসময় মাত্র ৭ হাজার টাকা বেতনে কল সেন্টারে চাকরি করতেন তিনি। রাতের শিফটে চাকরির পাশাপাশি দিনের বেলায় টিউশনি করেছেন। পরে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে কাজ করে পেয়েছেন প্রথম আন্তর্জাতিক আয়ের স্বাদ।

সেই মুসনাদই এখন স্কাইটেক সলিউশনসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। তাঁর প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ৯০০-এর বেশি কর্মী কাজ করছেন। মুসনাদের লক্ষ্য, কর্মীর সংখ্যা তিন হাজারে নিয়ে যাওয়া।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের খুলশী কনভেনশন হলে অনুষ্ঠিত ‘বিপিও সামিট বাংলাদেশ ২০২৬ (চট্টগ্রাম)’-এ মুসনাদ ই আহমেদের সঙ্গে দেখা হয়। পরে ঢাকার পান্থপথ ও উত্তরায় তাঁর প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ঘুরে তাঁর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প জানা যায়।

বাবার অসুস্থতায় থমকে যায় জীবন

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মরহুম সাদেকুল ইসলামের সন্তান মুসনাদ ছোটবেলা থেকেই সততা, শৃঙ্খলা ও আত্মসম্মানের শিক্ষা পেয়েছেন। মা মোছা. কোহিনুর বেগমের স্নেহে তিন ভাই-বোনের সংসারে বেড়ে ওঠা তাঁর।

২০০২ সালে ঢাকার কুর্মিটোলার বিএএফ শাহীন কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হন মুসনাদ। গ্রামের পরিবেশ থেকে রাজধানীতে এসে নতুন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সময়ই ঘটে বড় বিপর্যয়। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার মাত্র তিন মাস আগে তাঁর বাবা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হঠাৎ শয্যাশায়ী হয়ে পড়ায় অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে পরিবার। মুসনাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।

ডিগ্রির পাশাপাশি দক্ষতার সন্ধান

উচ্চমাধ্যমিকের পর রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকায় ভর্তি হন মুসনাদ। পড়াশোনার খরচ চালাতে কখনো টিউশনি করেছেন, কখনো কোচিং সেন্টারে কাজ করেছেন। ২০০৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ করেন তিনি।

এ সময় তাঁর উপলব্ধি হয়, শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, বাস্তব দক্ষতাই কর্মজীবনে এগিয়ে যাওয়ার বড় হাতিয়ার। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে কম্পিউটার ও স্পোকেন ইংলিশের প্রশিক্ষণ নেন তিনি।

ইংরেজি শেখার জন্য বাসে যাতায়াতের সময় রাস্তার পাশের সাইনবোর্ড পড়ে উচ্চারণ অনুশীলন করতেন। ছোট ছোট এসব চর্চাই পরবর্তী সময়ে তাঁর পেশাগত জীবনে কাজে আসে।

৭ হাজার টাকার চাকরি থেকে আন্তর্জাতিক আয়

২০০৮ সালে একটি কল সেন্টারে কাস্টমার সার্ভিস এজেন্ট হিসেবে মাত্র ৭ হাজার টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেন মুসনাদ। রাতের শিফটে চাকরি এবং দিনের বেলায় টিউশনি—দুই কাজ একসঙ্গে চালিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে।

পরে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে কাজ শুরু করেন। টেলিমার্কেটিং ও কাস্টমার সার্ভিসের কাজ করে প্রথমবার ৪০০ মার্কিন ডলার আয় করেন। সেই আয় তাঁর কাছে শুধু অর্থ নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশে বসে কাজ করার আত্মবিশ্বাসও তৈরি করে।

তিন ল্যাপটপে শুরু স্কাইটেক

২০১৩ সালে সঞ্চিত দেড় লাখ টাকা এবং ব্যাংক থেকে ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে স্কাইটেক সলিউশনস প্রতিষ্ঠা করেন মুসনাদ। দুটি ভাড়া করা কক্ষ ও তিনটি ল্যাপটপ দিয়ে শুরু হয় প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা।

শুরুতে গ্রাহক পাওয়া, দক্ষ কর্মী তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা অর্জন—সবকিছুই ছিল চ্যালেঞ্জের। তবে সবচেয়ে বড় সংকট আসে ২০১৬ সালে। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনে একের পর এক প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়। ৪৫ কর্মীর প্রতিষ্ঠান নেমে আসে মাত্র ৯ জনে।

সে সময় নিজের জমানো ১০ লাখ টাকার এফডিআর ভেঙে আবার ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন মুসনাদ। সংকটের সময় যাঁরা তাঁর সঙ্গে ছিলেন, সেই ৯ কর্মীকেও ধরে রাখেন। পরে নতুন বাজার ও গ্রাহক পাওয়ার মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ায় প্রতিষ্ঠানটি।

এখন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার গ্রাহক

বর্তমানে স্কাইটেক সলিউশনস যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য বিপিও ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা দিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের কাস্টমার সার্ভিস, লিড জেনারেশন ও ব্যাক-অফিস সাপোর্টসহ বিভিন্ন কাজ করছেন।

নিজের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে মুসনাদ ই আহমেদ বলেন, ‘প্রযুক্তি নয়, মানুষের দক্ষতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। একসময় আমি নিজে কল সেন্টারে চাকরি করতাম, এখন আমার নিজের কল সেন্টারে ৯০০ জন কাজ করে। এই সংখ্যা আমি তিন হাজারে নিয়ে যেতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘আমি তিস্তারপারের ছোট্ট গ্রামের ছেলে। আমার গল্প আসলে শুধু একজন উদ্যোক্তার গল্প নয়—এটি আত্মবিশ্বাসের গল্প, লড়াইয়ের গল্প, পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্প।’

বর্তমানে ৯০০-এর বেশি কর্মীর কর্মসংস্থান তৈরি করেছে স্কাইটেক সলিউশনস। ব্যবসার পাশাপাশি দেশের বিপিও খাতের উন্নয়নেও কাজ করছেন মুসনাদ ই আহমেদ।

কালের আলো/এসএ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন