ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে শাবানা আজমির নাম উচ্চারিত হয় আলাদা মর্যাদায়। পাঁচ দশকের বেশি দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি শুধু চরিত্রে অভিনয় করেননি, বরং নারীর অধিকার, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক বাস্তবতার নানা দিকও পর্দায় তুলে ধরেছেন। আজ ১৮ সেপ্টেম্বর ৭৬ বছরে পা দিলেন এই কিংবদন্তি অভিনেত্রী।
১৯৫০ সালে হায়দরাবাদে জন্ম শাবানা আজমির। তাঁর বাবা কবি কাইফি আজমি এবং মা অভিনেত্রী শওকত আজমি। শিল্প-সাহিত্যের আবহে বেড়ে উঠলেও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে ছিল শুরু থেকেই। কলেজে ভর্তির আগে পেট্রলপাম্পে কাজ করে কফি বিক্রি করেছেন তিনি।
সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়ার সময় থিয়েটারে যুক্ত হন শাবানা। পরে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ায় ভর্তি হয়ে অভিনয়ে প্রশিক্ষণ নেন এবং ক্লাসে প্রথম স্থান অর্জন করেন।
‘অঙ্কুর’ দিয়ে শুরু
শ্যাম বেনেগালের ‘অঙ্কুর’ দিয়ে ১৯৭৪ সালে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় শাবানার। প্রথম ছবিতেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। এরপর ‘আর্থ’, ‘খণ্ডহর’, ‘পার’, ‘মাসুম’, ‘মকবুল’ ও ‘ফায়ার’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন ভিন্নধারার অন্যতম শক্তিশালী অভিনেত্রী হিসেবে।
শাবানার অভিনয়ের বিশেষত্ব ছিল চরিত্রের ভেতরের আবেগ ও দ্বন্দ্বকে স্বাভাবিকভাবে ফুটিয়ে তোলা। বাণিজ্যিক সিনেমার পাশাপাশি সমান্তরাল ধারার চলচ্চিত্রেও তিনি সমানভাবে সফল হয়েছেন।
নারীর গল্প বলার দায়
দিল্লিতে ‘নারী ও সিনেমা’ বিষয়ক একটি সেমিনারে অংশ নেওয়ার পর নারীর অধিকার ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে তাঁর ভাবনায় বড় পরিবর্তন আসে বলে জানিয়েছেন শাবানা। এরপর তাঁর অভিনীত বিভিন্ন চরিত্রে নারীর আত্মপরিচয়, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
‘আর্থ’ সিনেমায় স্বামীর প্রতারণার পর নিজের আত্মসম্মান নিয়ে দাঁড়ানো নারীর চরিত্রে তাঁর অভিনয় ব্যাপক প্রশংসা পায়। ‘ফায়ার’ সিনেমাতেও প্রচলিত সামাজিক ধারণার বাইরে গিয়ে নারীর ব্যক্তিসত্তা ও ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরেন তিনি।
অর্থ নয়, চরিত্রই ছিল গুরুত্বপূর্ণ
ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময়ে শাবানা আজমি বাণিজ্যিক ছবির পাশাপাশি স্বল্প বাজেটের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিনেমায় অভিনয় করেছেন। তাঁর কাছে পারিশ্রমিকের চেয়ে চরিত্রের গুরুত্বই বেশি ছিল বলে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে।
নিজের ক্যারিয়ার প্রসঙ্গে শাবানা বলেছেন, তিনি যখন অভিনয় শুরু করেন, তখন ‘সমান্তরাল’ বা ‘আর্ট সিনেমা’ শব্দগুলোর প্রচলন ছিল না। সেই সময় নারী চরিত্রগুলো আরও জটিল হয়ে উঠছিল এবং তিনি সেই পরিবর্তনের অংশ হতে পেরেছিলেন।
জাভেদ আখতারের সঙ্গে সংসার
ব্যক্তিজীবনে চিত্রনাট্যকার ও কবি জাভেদ আখতারের সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য। দীর্ঘদিনের এই সম্পর্ককে শাবানা বন্ধুত্বনির্ভর বলে বর্ণনা করেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় শাবানা। পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়েও অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ অটুট। প্রিয় চরিত্র কোনটি—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি একবার বলেছিলেন, তাঁর প্রিয় চরিত্র এখনো আসেনি।
উল্লেখযোগ্য পাঁচ সিনেমা
‘অঙ্কুর’ (১৯৭৪): শ্যাম বেনেগালের এই সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক এবং প্রথম জাতীয় পুরস্কার।
‘আর্থ’ (১৯৮২): মহেশ ভাটের এই সিনেমায় প্রতারিত এক নারীর আত্মমর্যাদার লড়াইয়ে শক্তিশালী অভিনয় করেন শাবানা।
‘খণ্ডহর’ (১৯৮৪): মৃণাল সেনের সিনেমায় নিঃসঙ্গতা ও অপূর্ণতার গভীর আবেগ ফুটিয়ে তোলেন তিনি।
‘পার’ (১৯৮৪): গৌতম ঘোষের এই সিনেমায় গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের জীবনসংগ্রাম উঠে আসে। ছবিটির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান শাবানা।
‘ফায়ার’ (১৯৯৬): দীপা মেহতার সিনেমায় প্রচলিত সামাজিক ধারণার বাইরে নারীর ব্যক্তিসত্তা ও ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরেন তিনি।
অভিনয়ের ধরন, চরিত্র নির্বাচনের সাহস এবং সামাজিক বাস্তবতাকে পর্দায় তুলে ধরার কারণে ভারতীয় সিনেমায় শাবানা আজমির অবস্থান আজও স্বতন্ত্র। তাঁর নিজের ভাষায়, সাফল্য শুধু বাণিজ্যিক মানদণ্ডে মাপা যায় না।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
কালের আলো/এসএ

বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১:০৮ অপরাহ্ণ