চট্টগ্রামে পাঁচ দিন মর্গে থাকার পর জীবিত ফিরে আসার দাবি করা খোরশেদ আলমের ১৭ বছর আগের সেই ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। তার দাবির পক্ষে কোনো নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি তার মা ও স্ত্রীর বক্তব্যেও ঘটনার বর্ণনায় রয়েছে একাধিক অসঙ্গতি।
২০০৯ সালের জুনে চট্টগ্রামের বায়েজিদ কুঞ্জছায়া এলাকার সাবেক হেলপার খোরশেদ দাবি করেছিলেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার এক দিন পর তার মৃত্যু হয়। এরপর তার মরদেহ পাঁচ দিন মর্গে রাখা হয়েছিল। পরে বাড়ি নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্স গর্তে পড়ে ঝাঁকুনি দিলে তিনি নড়ে ওঠেন বলে দাবি করেন তিনি।
সম্প্রতি নিজের এই ‘অলৌকিক’ ঘটনার গল্প ও আর্থিক সংকটের কথা তুলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের কাছ থেকে সহযোগিতাও নেন খোরশেদ।
তবে অনুসন্ধানে তার মায়ের বক্তব্যের সঙ্গে খোরশেদের দাবির অমিল পাওয়া গেছে। খোরশেদের মা সায়েরা বেগম জানান, মর্গ থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে দুই নম্বর গেটে নেওয়ার ঘটনা ঘটেনি। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ট্রলিতে পড়ে থাকা অবস্থায় ছেলেকে দেখে তার সন্দেহ হয়। পরে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে তিনি জীবিত বলে প্রমাণিত হন।
সায়েরা বেগম বলেন, ছেলের চিকিৎসায় তিনি নিজের জমানো চার লাখ টাকা খরচ করেছেন। সুস্থ হয়ে ফেরার পর খোরশেদ আর তার সঙ্গে থাকতে চাননি বলেও জানান তিনি।
চিকিৎসা ব্যয়ের হিসাবেও রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য। মায়ের দাবি, খরচ হয়েছিল চার লাখ টাকা। অন্যদিকে খোরশেদ দাবি করেছেন, তার চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছিল ১২ লাখ টাকা।
খোরশেদের দ্বিতীয় স্ত্রী মানসুরা বলেন, মা-ছেলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধ রয়েছে। তারা আলাদাভাবে থাকেন। আর খোরশেদের ‘মৃত থেকে জীবিত’ হওয়ার ঘটনাটি তিনি সবার মুখে শুনেছেন, তাই বিষয়টি তার বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা জুয়েল জানান, খোরশেদের অসুস্থতার বিষয়টি তারা জানতেন। তবে তিনি মারা গিয়ে কয়েক দিন পর আবার জীবিত হয়ে ফিরেছেন—এমন কথা ছড়িয়ে পড়ায় অনেকে সেটিকে সত্য বলে ধরে নেন।
এ বিষয়ে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, তার কাছে বিভিন্ন ধরনের মানুষ সহযোগিতার জন্য আসেন এবং তিনি সাধ্যমতো সহায়তা করার চেষ্টা করেন। তবে বিষয়টি জানতে পেরে এখন তারা ঘটনাটি খতিয়ে দেখবেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও খোরশেদের দাবির পক্ষে প্রমাণ থাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক জসিম উদ্দিন বলেন, কোনো রোগী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলে সাধারণত ওয়ার্ড থেকেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করে স্বজনদের কাছে মরদেহ বুঝিয়ে দেওয়া হয়। খোরশেদের কাছে এ-সংক্রান্ত কোনো নথি থাকলে তা দেখানোর কথাও বলেন তিনি।
চিকিৎসক ডা. আমির খসরু বলেন, কোনো রোগীকে মৃত ঘোষণার আগে তার প্রেসার, পালস, চোখের মনি ও ইসিজিসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয়। এমন ঘটনা সত্যি ঘটে থাকলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা-নথি থাকার কথা। এসব নথি না থাকলে দাবিটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
কালের আলো/এমএসআইপি

চট্টগ্রাম সংবাদদাতা
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ২:৪৩ অপরাহ্ণ