মাথায় হেলমেট, তবু মৃত্যু-ঝুঁকি!

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৬:৩৬ অপরাহ্ণ

রাজধানীর সড়কে মোটরসাইকেলের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে হেলমেটের ব্যবহারও বেড়েছে। কিন্তু মাথায় হেলমেট থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না। রাজধানীর কয়েকটি দোকান ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে বিক্রি হওয়া হেলমেটের একটি অংশ এতটাই নিম্নমানের যে দুর্ঘটনার সময় সেগুলো আদৌ কতটা সুরক্ষা দিতে পারবে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। মাত্র ১৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে প্লাস্টিকের পাতলা আবরণ ও ভেতরে গেঞ্জির কাপড়ের মতো স্তরযুক্ত এসব ‘হেলমেট’। দেখতে হেলমেট হলেও কার্যকারিতার দিক থেকে এগুলো অনেকটা প্লাস্টিকের টুপির মতো।

নিরাপত্তার চেয়ে মামলা এড়ানোর তাগিদ
অনেক মোটরসাইকেল আরোহীর কাছে হেলমেট এখন নিরাপত্তার চেয়ে আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণের উপকরণ হয়ে উঠেছে। রাজধানীতে রাইড শেয়ারিং অ্যাপে বাইক চালানো আরিফুজ্জামান শাওন বলেন, হেলমেট না থাকলে পুলিশ মামলা দেয়। অনেক যাত্রী হেলমেট পরতে চান না। তাই পুলিশ ও মামলা এড়াতেই চালকেরা হালকা হেলমেট রাখেন।

এই বাস্তবতা হেলমেট ব্যবহারের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন তুলছে। দুর্ঘটনার সময় মাথা রক্ষার জন্য যে সরঞ্জাম অপরিহার্য, সেটি যদি কেবল পুলিশের মামলা এড়ানোর আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে আইন মানা হলেও নিরাপত্তার লক্ষ্য পূরণ হয় না।

বিএসটিআইয়ের সিল, তবু প্রশ্ন থেকেই যায়
বাংলাদেশে আমদানি করা হেলমেটের বড় অংশ ভারতীয়। এ ছাড়া চীন, স্পেন ও অস্ট্রেলিয়া থেকেও বিভিন্ন ধরনের হেলমেট আসে। ব্র্যান্ড ও মানভেদে এসব পণ্যের দাম সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৭২ হাজার টাকা পর্যন্ত। বাজারজাত করার আগে এসব হেলমেটের বিএসটিআই নিরাপত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক। বাজারে থাকা আমদানি করা হেলমেটের বেশির ভাগের গায়েই বিএসটিআই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সিল রয়েছে।

তবে পরীক্ষার ফল বলছে, সিল থাকলেই বাজারের সব হেলমেট মানসম্পন্ন—এমন নিশ্চয়তা নেই। গত ছয় মাসে বিএসটিআই ৪৯টি হেলমেটের নমুনা পরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে ৩৭টি গুণগত মান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও ১২টি ব্যর্থ হয়েছে। অর্থাৎ পরীক্ষিত নমুনার প্রায় ২৪ দশমিক ৫ শতাংশই মান পরীক্ষায় অকৃতকার্য। হেলমেট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ভালকানের সহকারী বিপণন কর্মকর্তা ফারাবী আহমেদ অবশ্য তাঁদের সব হেলমেট বিএসটিআই অনুমোদিত বলে দাবি করেছেন। আমদানির সময় প্রতিষ্ঠানটি বিএসটিআইয়ের শর্ত অনুসরণ করে বলেও জানান তিনি।

মোটরসাইকেল বাড়ছে, সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি
হেলমেটের মানের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে দেশের মোটরসাইকেলের সংখ্যা ও দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান দেখলে। বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬৬ লাখ। এর মধ্যে মোটরসাইকেল প্রায় ৪৮ লাখ ৭১ হাজার, যা মোট যানবাহনের প্রায় ৭৪ শতাংশ।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৬৭২ জন। ওই বছর সড়কে মোট মৃত্যুর ৩৬ শতাংশই ছিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহতদের। ফলে মোটরসাইকেল আরোহীদের মাথার সুরক্ষা এখন নিছক ব্যক্তিগত সতর্কতার বিষয় নয়; এটি সড়ক নিরাপত্তার বড় একটি অংশ।

মানসম্মত হেলমেটেই কমে মৃত্যুঝুঁকি
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, মানসম্মত হেলমেট মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুঝুঁকি ৪৮ শতাংশ কমায়। তাই শুধু হেলমেট ব্যবহারে সচেতনতা তৈরি করলেই হবে না, মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহারের নিশ্চয়তাও দিতে হবে। তাঁর মতে, পুলিশ চাইলে সড়কে মানহীন হেলমেট যাচাই করে জরিমানা করতে পারে। প্রযুক্তির মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কথাও বলেন তিনি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামানও বিষয়টিকে উৎস পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর মতে, আমদানি ও উৎপাদনের সময় কঠোরভাবে মান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানুষকে মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে। সম্মিলিত সচেতনতার মাধ্যমেই মানহীন পণ্যের ব্যবহার কমানো সম্ভব।

নিয়ন্ত্রণের আওতা বাড়াতে হবে
মানহীন হেলমেট বন্ধের দায়িত্ব শুধু মোটরসাইকেল চালকের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। আমদানি থেকে শুরু করে পরীক্ষা, বাজারজাতকরণ ও বিক্রি—প্রতিটি ধাপে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে সড়কে আইন প্রয়োগের সময় শুধু হেলমেট আছে কি না, তা নয়; সেটি নির্ধারিত নিরাপত্তামান পূরণ করছে কি না, সেটিও বিবেচনায় আনা দরকার।
কারণ দুর্ঘটনার মুহূর্তে হেলমেটের দাম, ব্র্যান্ড কিংবা গায়ে থাকা সিল নয়—তার প্রকৃত মানই নির্ধারণ করবে মাথাটি কতটা সুরক্ষিত থাকবে। তাই সড়ক নিরাপত্তায় এখন মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, মাথায় হেলমেট আছে কি না নয়; যে হেলমেটটি আছে, সেটি জীবন রক্ষার মতো মানসম্পন্ন কি না।

কালের আলো/এম/এএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন