উচ্চ রক্তচাপকে যথার্থই ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। অনেক সময় কোনো সুস্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই এই রোগ শরীরে বাসা বাঁধে এবং ধীরে ধীরে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, কিডনি জটিলতাসহ নানা প্রাণঘাতী অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ায়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, উচ্চ রক্তচাপ এখন আর শুধু বয়স্ক মানুষের সমস্যা নয়। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশও এই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সি প্রায় ১২ শতাংশ তরুণের উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত বা ঝুঁকিতে থাকার যে তথ্য উঠে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের কারণ।
একটি দেশের সবচেয়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী যদি অল্প বয়সেই অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে পড়ে, তার প্রভাব শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত পড়ে জাতীয় অর্থনীতি ও উৎপাদনশীলতার ওপরও। অথচ জীবনযাপনের কিছু পরিবর্তন উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনিয়মিত জীবনযাপন, রাত জাগা, অপর্যাপ্ত ঘুম, দীর্ঘ সময় কাজ বা পড়াশোনা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং ক্রমবর্ধমান মানসিক চাপ তরুণদের স্বাস্থ্যের জন্য বড় সতর্কসংকেত। এর সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ, ফাস্ট ফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও কোমলপানীয়ের অভ্যাস যুক্ত হলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। ধূমপান, মাদক গ্রহণ ও স্থূলতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।
তাই উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শুধু চিকিৎসকের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক চাপ মোকাবিলার অভ্যাস গড়ে তোলার বিষয়টি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্র—সব পর্যায়েই গুরুত্ব পেতে হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসা নিতে গিয়ে যেন কোনো রোগী ওষুধের সংকটে না পড়েন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ওষুধ সরবরাহের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ড. মলয় কান্তি মৃধা গবেষণাভিত্তিক কার্যকর পদক্ষেপ এবং স্বাস্থ্য বাজেট বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁদের বক্তব্যের সঙ্গে আমরা একমত যে, উচ্চ রক্তচাপের মতো বিস্তৃত জনস্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণা, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি এবং যথাযথ অর্থায়ন।
গণমাধ্যমকেও এ ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। আতঙ্ক সৃষ্টি নয়, বরং সঠিক তথ্য ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তরুণদের সুস্থ রাখা মানে দেশের ভবিষ্যৎ কর্মশক্তিকে সুরক্ষিত রাখা। তাই উচ্চ রক্তচাপের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিকে এখনই গুরুত্ব দিয়ে ব্যক্তি সচেতনতা থেকে রাষ্ট্রীয় নীতি—সব পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আজকের অবহেলা যেন আগামী দিনের বড় স্বাস্থ্যসংকটে পরিণত না হয়।
কালের আলো/এম/এএইচ

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৮:২৯ অপরাহ্ণ