সঞ্চয়পত্রে বিক্রির জোয়ার, সরকারের হাতে ৪৩৬ কোটি

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৬:২৮ অপরাহ্ণ

দীর্ঘদিনের ঋণাত্মক ধারা পেরিয়ে আবারও ইতিবাচক অবস্থানে ফিরেছে সঞ্চয়পত্র। সদ্যঃসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ৪৩৬ কোটি ৬ লাখ টাকা। অথচ এর আগের অর্থবছরে নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এই পরিবর্তনকে সঞ্চয়পত্র খাতের বড় ধরনের ঘুরে দাঁড়ানো হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৯২ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে ৩৫ দশমিক ১৮ শতাংশ। তবে বিক্রি বাড়লেও সরকারের নতুন ঋণ পাওয়ার পরিমাণ খুব বেশি বাড়েনি। কারণ নতুন করে যে অর্থ এসেছে, তার প্রায় পুরোটাই চলে গেছে আগের বিনিয়োগকারীদের মূল টাকা ফেরত দিতে।

বিক্রি ৯২ হাজার কোটি, হাতে থাকল ৪৩৬ কোটি
সদ্যঃসমাপ্ত অর্থবছরে নতুন সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকারের আয় হয়েছে ৯২ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা। একই সময়ে পুরনো সঞ্চয়পত্রের আসল বাবদ গ্রাহকদের ফেরত দেওয়া হয়েছে ৯২ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। ফলে দুই অঙ্কের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৩৬ কোটি টাকা।

অর্থাৎ বাজারে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বাড়লেও সরকারের কোষাগারে নতুন অর্থ হিসেবে যুক্ত হয়েছে তুলনামূলক সামান্য অংশ। নতুন বিনিয়োগকারীদের অর্থের বড় অংশই পুরনো বিনিয়োগকারীদের দায় পরিশোধে ব্যয় হয়েছে।

লক্ষ্যের ধারেকাছেও নেই
সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল এর চেয়ে অনেক বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে এ খাত থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু অর্থবছর শেষে নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৩৬ কোটি টাকা।

ফলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্রের ওপর সরকারের নির্ভরতা আগের তুলনায় কমেছে। প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহে ব্যাংকঋণ ও সরকারি সিকিউরিটিজের মতো বিকল্প উৎসের গুরুত্ব বেড়েছে।

৪২ হাজার কোটি থেকে কয়েক শ কোটি
একসময় সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের অন্যতম বড় উৎস ছিল সঞ্চয়পত্র। ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ ছিল প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। এরপর ধীরে ধীরে কমেছে নতুন ঋণের পরিমাণ। সর্বশেষ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ৪৩৬ কোটি টাকায়।

এর পেছনে বড় কারণ পুরনো
সঞ্চয়পত্রের মূলধন ও মুনাফা পরিশোধের চাপ। গ্রাহকদের মূল ও মুনাফা বাবদ মোট পরিশোধও বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় এই পরিশোধ বেড়েছে ২৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ বা ১৭ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা।

ঋণাত্মক থেকে ইতিবাচক কেন
সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির হিসাব থেকেই বোঝা যায় সরকারের প্রকৃত নতুন অর্থপ্রাপ্তির চিত্র। মোট বিক্রির অর্থ থেকে গ্রাহকদের মূল ও মুনাফা বাবদ পরিশোধ বাদ দেওয়ার পর যে অর্থ থাকে, সেটিই নিট বিক্রি।

এই হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন বিক্রির চেয়ে পুরনো বিনিয়োগকারীদের পরিশোধের পরিমাণ বেশি ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিক্রি বাড়ায় এবং পরিশোধের তুলনায় সামান্য বেশি হওয়ায় নিট বিক্রি আবার ইতিবাচক হয়েছে। তবে ইতিবাচক হলেও ৪৩৬ কোটি টাকা সরকারের জন্য বড় নতুন অর্থের উৎস হয়ে ওঠেনি।

সঞ্চয়পত্র বিক্রির ঊর্ধ্বগতি
বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ফেরার ইঙ্গিত দিলেও সরকারের জন্য এ খাতের ভূমিকা বদলে গেছে। একসময় সঞ্চয়পত্র থেকে বিপুল অঙ্কের নতুন ঋণ মিললেও এখন নতুন বিক্রির অর্থের প্রায় পুরোটাই পুরনো দায় পরিশোধে চলে যাচ্ছে। ফলে বিক্রি বাড়ার ইতিবাচক প্রবণতার পাশাপাশি সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ ব্যবস্থাপনায় সঞ্চয়পত্রের সক্ষমতা কতটা বাড়ে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

এম/এএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন