সৌদির হাতে ৪৮ এফ-৩৫, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমীকরণ

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১১:৫৫ অপরাহ্ণ

সৌদি আরবের কাছে ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাব্য অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের এই প্যাকেজে যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম ও ৪৯টি ইঞ্জিন রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ১৭ সেপ্টেম্বর এ অনুমোদনের কথা জানায়। তবে চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত বিক্রি নয়; মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনার ধাপও রয়েছে।

ওয়াশিংটনের ভাষ্য, এই বিক্রি সৌদি আরবের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়াবে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের সামরিক প্রযুক্তিগত প্রাধান্য বজায় রাখার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সৌদিকে এফ-৩৫ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে সামঞ্জস্য করা হবে।

কেন এফ-৩৫-এর দিকে রিয়াদের নজর
সৌদি আরব বহুদিন ধরেই এফ-৩৫ কেনার আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। এই যুদ্ধবিমান পেলে দেশটির বিমানবাহিনী এমন একটি প্ল্যাটফর্ম পাবে, যা প্রচলিত যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি স্টেলথ, উন্নত সেন্সর ও তথ্য সংযুক্তির সক্ষমতাকে একসঙ্গে কাজে লাগায়।

বিশেষ করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন সৌদি আরবের জন্য আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ও আক্রমণ সক্ষমতার গুরুত্ব বাড়িয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিয়াদের এফ-৩৫ চাওয়ার পেছনে সামরিক আধুনিকায়ন এবং ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনাও গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট।

এফ-৩৫ আসলে কতটা আলাদা
লকহিড মার্টিনের তৈরি এফ-৩৫ লাইটনিং-২ মূলত স্টেলথ যুদ্ধবিমান। এর নকশার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো শত্রুর রাডার ও অন্যান্য শনাক্তকরণ ব্যবস্থার কাছে বিমানের দৃশ্যমানতা কমিয়ে আনা। একই সঙ্গে এতে রয়েছে উন্নত সেন্সর ও কম্পিউটিং ব্যবস্থা, যা পাইলটকে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি সম্পর্কে দ্রুত তথ্য দিতে এবং বিভিন্ন উৎসের তথ্য একত্রে ব্যবহার করতে সহায়তা করে।

এর তিনটি প্রধান সংস্করণ—এফ-৩৫এ, এফ-৩৫বি ও এফ-৩৫সি। সৌদির প্রস্তাবিত বিমানগুলো হলো প্রচলিত রানওয়ে থেকে ওঠানামা করতে সক্ষম এফ-৩৫এ সংস্করণ। প্যাকেজে ৪৮টি বিমানের জন্য ৪৮টি ইঞ্জিনের পাশাপাশি একটি অতিরিক্ত ইঞ্জিনও রয়েছে।

তিন মডেল, তিন ধরনের যুদ্ধক্ষেত্র
এফ-৩৫এ সাধারণ বিমানঘাঁটি থেকে পরিচালনার জন্য তৈরি। এফ-৩৫বি-এর বিশেষত্ব হলো স্বল্প দূরত্বে উড্ডয়ন ও প্রায় উল্লম্ব অবতরণের সক্ষমতা, যা সীমিত রানওয়ে বা ছোট ঘাঁটির জন্য কার্যকর। আর এফ-৩৫সি বিমানবাহী রণতরী থেকে পরিচালনার উপযোগী করে তৈরি।

এই তিন সংস্করণের ভিন্নতা দেখায়, এফ-৩৫ কেবল একটি যুদ্ধবিমান নয়; ভিন্ন ধরনের সামরিক পরিবেশে ব্যবহারের জন্য একই প্রযুক্তি পরিবারের একাধিক সংস্করণ।

কেন বদলাল ওয়াশিংটনের অবস্থান
সৌদিকে এফ-৩৫ দেওয়ার পথে দীর্ঘদিন বড় প্রশ্ন ছিল ইসরাইলের ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’—অর্থাৎ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর তুলনায় ইসরাইলের সামরিক প্রযুক্তিগত সুবিধা। সৌদি আরবকে একই শ্রেণির অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান দেওয়ার ফলে সেই ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

তবে বর্তমান মার্কিন প্রশাসন সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করার পথে এগিয়েছে। ২০২৫ সালে দুই দেশের মধ্যে বড় প্রতিরক্ষা প্যাকেজের ঘোষণার পর এফ-৩৫ চুক্তির উদ্যোগও সামনে আসে। এবার পররাষ্ট্র দপ্তরের অনুমোদন সেই প্রক্রিয়াকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি শুধু ৪৮টি যুদ্ধবিমান কেনাবেচার ঘটনা নয়। সৌদি আরবের হাতে এফ-৩৫ পৌঁছালে দেশটির বিমান সক্ষমতায় নতুন প্রযুক্তিগত স্তর যুক্ত হবে। আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি হবে সৌদির সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন সমীকরণ সামলানোর পরীক্ষা। চুক্তির চূড়ান্ত পরিণতি এখন কংগ্রেসের পর্যালোচনা ও পরবর্তী প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।

এম/এএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন