ঢাকায় বসেই নজরে দেশের শ্রেণিকক্ষ

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১:১০ অপরাহ্ণ

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক আছেন কি না, নির্ধারিত সময়ে পাঠদান হচ্ছে কি না কিংবা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কেমন—এসব জানতে আর শুধু রুটিন পরিদর্শনের ওপর নির্ভর করতে চায় না সরকার। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবার প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষকে নিয়ে আসতে চাইছে রিয়েল টাইম মনিটরিংয়ের আওতায়। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকায় বসেই দেশের দূরবর্তী কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে চলমান পাঠদান সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।

  • সিসিটিভি ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে রিয়েল টাইম মনিটরিং
  • বাড়বে পাঠদানের মান ও জবাবদিহি
  • মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে মাউশির নতুন পদক্ষেপ

পরিদর্শনের অপেক্ষা নয়, চোখ থাকবে প্রতিদিন
প্রচলিত ব্যবস্থায় কোনো প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের মান যাচাই করতে পরিদর্শককে সরেজমিনে যেতে হয়। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের বাস্তব চিত্র পেতে সময় লাগে এবং আকস্মিক অনিয়ম অনেক সময় পরিদর্শনের আগেই আড়াল হয়ে যায়। কেন্দ্রীয় ডিজিটাল মনিটরিং সেই সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পারে। সিসিটিভি ক্যামেরা ও কেন্দ্রীয় প্রযুক্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে মাউশির কর্মকর্তারা প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।

ফলে শিক্ষক যথাসময়ে ক্লাসে প্রবেশ করছেন কি না, পাঠদানের নির্ধারিত সময় ঠিকভাবে কাজে লাগছে কি না কিংবা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির চিত্র কী—এসব তথ্য দ্রুত পাওয়া যাবে। এতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও হতে পারে আরও তথ্যভিত্তিক।

ক্যামেরার আগেই শুরু ‘লাইভ’ পর্যবেক্ষণ
কেন্দ্রীয় সিসিটিভি ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হওয়ার আগেই এর প্রস্তুতি হিসেবে শুরু হয়েছে ভার্চুয়াল মনিটরিং। মাউশির কর্মকর্তারা হঠাৎ প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কল করে নির্দিষ্ট শ্রেণিকক্ষে যেতে বলছেন। সেখান থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ও পাঠদানের পরিবেশ সরাসরি দেখা হচ্ছে।

গত আগস্টে ৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান এভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব পর্যবেক্ষণে শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতিসহ বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা ধরা পড়েছে। ফলে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তাৎক্ষণিক সংশোধনের নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটি দেখাচ্ছে, প্রযুক্তি শুধু নজরদারির মাধ্যম নয়; দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করার হাতিয়ারও হতে পারে।

বিদ্যমান ক্যামেরাই হতে পারে বড় সম্পদ
মাউশির তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫২ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে প্রায় ৫২ হাজার সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় মনিটরিং চালুর ক্ষেত্রে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে না। বিদ্যমান অবকাঠামোকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা গেলে তুলনামূলক দ্রুতই বড় পরিসরে ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব হতে পারে।

মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানিয়েছেন, ৮ থেকে ১০ হাজার প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি রয়েছে। এগুলোকে অ্যাপের মাধ্যমে এক সূত্রে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বাস্তবায়ন হলে প্রয়োজনের সময় যেকোনো প্রতিষ্ঠান পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।

উপস্থিতি থেকে পাঠদানের মান—তথ্য হবে সিদ্ধান্তের ভিত্তি
এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা কেবল শিক্ষক উপস্থিতি যাচাইয়ে নয়; বরং শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় বাস্তব তথ্যের ব্যবহার বাড়ানোয়। কোনো অঞ্চলে নিয়মিত শিক্ষক অনুপস্থিতির প্রবণতা থাকলে তা দ্রুত শনাক্ত করা যাবে। কোথাও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কম হলে কারণ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে। একইভাবে অবকাঠামো, শিক্ষা উপকরণ কিংবা শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনায় ঘাটতিও নজরে আসতে পারে।

মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক মো. নাজমুল হকের মতে, ডিজিটাল মনিটরিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব চিত্র জানা গেলে দুর্বলতা দ্রুত শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। তাঁর মতে, নিয়মিত, তথ্যভিত্তিক ও ফলমুখী মনিটরিংয়ের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব।

পরীক্ষাকেন্দ্রের সাফল্য থেকে শ্রেণিকক্ষে
পরীক্ষাকেন্দ্র সিসিটিভির মাধ্যমে তদারকিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ইতোমধ্যে প্রশাসনিক পর্যায়ে পরিচিত হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাকে এবার শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা যেহেতু শ্রেণিকক্ষ, সেখানে প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি চালু হলে প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে দূরত্ব কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, দক্ষ জনবল এবং কার্যকর নীতিমালার ওপর। কেন্দ্রীয়ভাবে বিপুলসংখ্যক ক্যামেরা থেকে আসা তথ্য কীভাবে বিশ্লেষণ করা হবে, কীভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে—সেই কাঠামোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

নজরদারির লক্ষ্য যখন মানসম্মত শিক্ষা
শ্রেণিকক্ষে ক্যামেরা বসানোই এই উদ্যোগের মূল সাফল্য নয়। প্রকৃত সাফল্য হবে তখনই, যখন এর মাধ্যমে শিক্ষককে শাস্তির ভয়ে নয়, দায়িত্ব পালনে আরও সচেতন করা যাবে; শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বাড়বে; শ্রেণিকক্ষ হবে আরও সুশৃঙ্খল এবং পাঠদান হবে সময়োপযোগী ও কার্যকর।

প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগ তাই কেবল ‘কে ক্লাসে আছেন’ তা দেখার ব্যবস্থা নয়। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি হতে পারে শিক্ষা প্রশাসনের এমন একটি তথ্যভিত্তিক কাঠামো, যেখানে সমস্যা দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে সমস্যাকে আগেই শনাক্ত করে সমাধানের সুযোগ থাকবে। আর সেই পরিবর্তনই শ্রেণিকক্ষের নজরদারিকে ধীরে ধীরে রূপ দিতে পারে শিক্ষার মানোন্নয়নের কার্যকর ব্যবস্থায়।

এম/এএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন